618> || এক জন্ম দিন ||
618>|| এক জন্ম দিন ||
<-©➽-আদ্যনাথ->
সেদিন যাচ্ছিলাম মালকেরার পথে,
হঠাৎ দেখা সোমেনের সাথে,
সোমেন মালকেরা স্টেশনের কাছেই থাকে। সোমেন আমাকে দেখে রকটু অবাকই হয়েছিল। কারন আমার ঐদিকে যাবার কোন কারণই নাই।
এমনিতেও সত্যি আমার ঐদিকে যাবার কোন কারন ছিলনা, তবে একটি কারণ নিশ্চই ছিল, আর সেটা হলো উমাশঙ্করের সাথে একটু দেখা করতে এসেছিলাম।
উমাশঙ্কর আমাদের সাথেই ডিউটি করে,
প্রকৃত পক্ষে উমাশঙ্কর আমাদের শিফটের এটেনডেন্স ক্লার্ক।
সোমেনকে আমি সেই কথাই জানালাম।
যাইহোক এরপরে আমি জানতে চাইলাম
টাটা কলিয়ারির পুরণ কোয়াটার গুলি কোনদিকে।
এমন কথা জিজ্ঞাসা করতে সোমেন বেশ একটু অবাক হয়ে আমাকে ওই দিকে যাবার রাস্থা দেখিয়ে দিল। আমি সোমেন কে অনুরোধ করলাম আমার সাথে যাবার জন্য। সোমেন রাজি হয়ে জাওয়াতে আমরা দুইজনে টাটা কলিয়ারির কোয়াটারের দিকে চললাম।
সেখানে গিয়ে দেখা হল হরিপদ বাবুর সাথে।
আমাদের প্রজেক্টের কাছে হরিপদবাবু রোজ আসতো বাদাম ভাজা নিয়ে। আমরা অনেকেই রোজ ওনারথেকে বাদাম কিনে খেতাম।
এখানে হরিপদ বাবুকে এখানে দেখে বেশ একটু আশ্চর্য হলাম।
উনি আমাকে দেখে চিন্তে পেরে খানিকটা জোর করেই ওনার কোয়াটারে নিয়ে গেলেন। ওখানে গিয়ে যা দেখলাম সেটা আমার চিন্তার বাইরে অবিশ্বাস্য এক গল্প যেন।
আজ আমি সেই কথাই লিখতে বসেছি।
হরিপদ বাবুর বার বার অনুরোধে ওনার কোয়াটারে গেলাম।
সেখানে গিয়ে দেখি ঘড়ের ভেতরে অনেক বেলুন দিয়ে সাজানো।
দেখে বুঝলাম কোন বাচ্ছার জন্মদিন পালন করা হচ্ছে। এবং বেশ কয়েকজন নিমন্ত্রিত ।
আমি এমন সময়ে এমন অনুষ্ঠানে খালি হাতে বেশ একটু ইতস্তত বোধ করছিলাম।
একটু পরেই দেখলাম হরিপদ বাবু একটি বাচ্চা মেয়েকে কোলে করে নিয়ে এসে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিলেন এবং ওর সামনে একটি ছোট কেক রেখে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলেন।
আমার বুঝতে বাকি রইলনা যে এই বাচ্চাটির জন্ম দিন পালন হচ্ছে।
আমি হরিপদ বাবুকে জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হলাম যে আপনার এত সুন্দর কোয়াটার ছেলে মেয়েরাও আছে দেখছি,
তাহলে আপনার কে টাটা কলিয়ারিতে চাকুরী করেন। এবং আপনি কেন এত দূর থেকে বাদাম বিক্রি করতে যান ওই আকাশ কিনারীতে।
আমার কথা শুনে একজন ভদ্রলোক বললেন, না না ওনার কেউ এখানে চাকুরী করে না।
এটা আমার কোয়াটার আমার নিজের কোন ছেলে মেয়ে নাই। আমি দুই দিন আগে ওনাকে আমার এখানে নিয়ে এসেছি।
তারপরে শুনলাম সম্পুর্ন কাহিনী।
এই ভদ্র লোকের নাম অমল ঘোষ।
উনি টাটা কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার।
ওনার মুখেই শুনলাম এই হরিপদ বাবুকে উনি থাকতে দিয়েছেন নিজের সাথে।
চিনাবাদাম বিক্রি করেই ওনার দিন চলে।
উনি তিনটি অনাথ শিশুকে লালন পালন করেন এই বাদাম বিক্রি করে।
এই কয়েকদিন আগে আগুন লেগে ওনার কুঁড়ে ঘরটি পুড়ে গেছে।
ওনার এই অবস্থা দেখে ওনাকে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে আসলাম আমার কোয়াটারে।
আজ যে বাচ্ছা মেয়েটির জন্ম দিন তার একটি পা পালিও আক্রান্ত।
এখানকার হসপিটালের সার্জেন্টের কথা মতন নিউ দিল্লির এইমসে ওনার পরিচিত সার্জেনের সাথে যোগাযোগ করে দিয়েছেন।আমি বাচ্চাটির সকল রিপোর্ট পাঠিয়ে এইমসের ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি। আমাদের অফিসের সকলের প্রচেষ্টায় মেয়েটির অপারেশনের ব্যবস্থার চেষ্টা চলছে। জানিনা ঈশ্বরের কি ইচ্ছা।
সব ঠিক থাকলে আগামী আগামী 10 তারিখে অপারেশন হবে।তাই বাচ্চাটিকে নিয়ে 8 তারিখের মধ্যে ওখানে পৌঁছতে হবে।
এখান থেকে আমি ও আরও একজন যাচ্ছি হরিপদ বাবুকে সাথে নিয়ে।
তবে সমস্যা কিছু আছে ।
আমি তখন বললাম আপনারা যান আমরাও চেষ্টা করে কিছু অর্থের ব্যবস্থা করতে পারব নিশ্চয়।
আমল বাবু জানালেন এমনি করে সকলে চেষ্টা করলে হয়তো টাকার সমস্যা মিটবে কিন্তু আসল সমস্যা হবে যদি অপারেশন হয় আর তারজন্য যদি ব্লাডের প্রয়োজন হয় তখন হবে মুশকিল। কারন মেয়েটির ব্লাড গুরুপ ওনেগেটিভ যেটা যোগাড় করাই মুশকিল হবে।
আমি বললাম দেখুন ইশ্বর যখন আজ বাচ্চাটির জন্ম দিনে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে তখন নিশ্চই ঈশ্বরের কোন সুপ্ত ইচ্ছা আছে। নয়তো আমি তো যাচ্ছিলাম
উমাশঙ্কর বাবুর সাথে দেখা করতে।
কিন্তু দেখা হয়ে গেল হরিপদ বাবুর সাথে ও আপনাদের সাথে, এবং জানলাম আপনারা সকলে মিলে এক মহৎ কার্যের দিগেঅগ্রসর হচ্ছেন।
আর ঈশ্বরের কি লীলা, নিউ দিল্লি ও পূরণে দিল্লি দুই জায়গাতেই আমার কিছু জানাচেনা মানুষ থাকেন তাদের মধ্যে দুইজনকে আমি জানি ওদের ব্লাড গুরুপ ওনিগেটিভ,এবং আশা করি ওখানে আরও কিছু মানুষ পাওয়া যাবে রক্তের জন্য।
আমি ওখানে দাঁড়িয়ে তখনই ফোন করলাম নিউ দিল্লির গিরিজিকে।
ফোন করে গিরিজকে আমাদের কুশল জানিয়ে বর্তমানের সকল বিস্তার জানাতেই গিরিজি জানালেন কোন অসুবিধা হবেনা, কারন গিরিজি অন্তত চার পাঁচ জনকে জোগাড় করতে পারবে।
রক্তের জন্য। তাছাড়া আমার সাথে ছিল
সোমেন, আরও নাকি ব্লাড গুরুপ
ওনিগেটিভ এবং সোমেন জানাল প্রয়োজন হলে ও নিজে পৌঁছে যাবে হসপিটালে।
অর্থাৎ রক্তের জোগাড়ের ব্যাবস্থা মোটামুটি হয়েই গেল।
সেদিন ছিল এক সেপ্টেম্বর আর বাচ্চাটির
অপারেশনের তারিখ 10 সেপ্টেম্বর অর্থাৎ আমার জন্ম দিন।
সেকারণে আমি একটু বেশি উৎসাহী হয়ে বললাম আপনারা কোন চিন্তা করবেন না
সব ঠিক হয়ে যাবে।
এইটুকু বলে আমি চলে এসে নিজের ডিউটি প্লেসে এসে সকলকে বিস্তারিত জানালাম। সকলেই কথাদিল কিছু করে টাকা দেবেন।
সত্যি তার পরের দিন অবাক হয়ে গেলাম
সকলে মিলে আশী হাজার টাকা যোগার করে দিল। আর আমি কুরিহাজার দিয়ে একলাখ টাকার ট্রাভেলার চেক নিয়ে দিয়ে আসলাম।
আমাদের এই টাকা পেয়ে ওনাদের মনোবল বেশ বেড়ে গেল।
সে যাইহোক আমি মনেমনে ভাবলাম এক জন্মদিন পালন হল।
আর আগামী দশ তারিখে আর এক জন্মদিন পালন হবে।
সত্যি সেদিন 10 তারিখ রাত্রে ফোনকরে
অমল বাবু জানালেন অপারেশন খুব ভালো হয়েছে।
তারপরে রোজই একবার করে ফোনে ওনারা জানতেন কুশল মঙ্গল।
প্রায় দেড়মাস পরে ওনারা সকলে ফিরে আসলেন।
ফিরে এসেই অমল বাবু জানালেন যে দিল্লিতে পৌঁছতেই গিরিজি ওনাদের রিসিভ করে নিয়ে গেছিলেন।
এবং হসপিটালের কাছেই গিরিজির জানাশোনা কোন বাড়িতে হরিপদ বাবুদের
সকলর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে ছিলেন।
এবং গিরিজি রোজ আসতেন হসপিটালে বাচ্চাটির অপারেশনে পাঁচ বোতল রক্তের সবটাই গিরিজি জোগাড় করে দিয়ে ছিলেন।
সকল কথা শুনে আমি গিরিজিকে ধন্যবাদ জানাতে ফোন করতেই গিরিজি জানালেন এমন একটি অনাথ বাচ্ছার জন্য কিছু করতে পেরেছে তার জন্য উনি আমাদের ধন্যবাদ জানালেন।
এবং আরও জানালেন 10 সেপ্টেম্বর নাকি গিরিজিরও জন্ম দিন, তিনি জানালেন ওনার এবারের জন্ম দিন নাকি এক সার্থক জন্ম দিন, আর নিজের জন্ম দিনে এভাবে অনাথ শিশুটির জন্য কিছু করতে পেরে উনি নাকি ভীষণ খুশি।
এদিকে এমন সংবাদ জেনে আমিও খুশি হলাম যে আমার আর গিরিজি দুজনেরই জন্মদিন দশ সেপ্টেম্বর।
আর আমাদের জন্ম দিনেই বাচ্চাটির অপারেশন হোল।
এর পরে মাঝে মাঝেই আমি যেতাম হরিপদ বাবুর কোয়াটারে ।
দেখেছিলাম তিন চার মাসের মধ্যেই বাচ্চাটি সম্পুর্ন সুস্থ হয়ে ঠিক মতন হাটা চলা করতে পারছিল।
বাচ্চাটি সম্পুর্ন সুস্থ হবার পরে হরিপদ বাবু বাচ্চাটিকে নিয়ে আমাদের কলিয়ারিতে এসেছিলেন ।
বাচ্চাটিকে দেখে তখনি আমাদের ম্যানেজার মুখার্জি সাহেব খুশি হয়ে হরিপদ বাবুকে বলেছিলেন যে উনি বাচ্চাটির আজীবন পড়াশুনার খরচা দেবেন। এবং সেই কারণে তখনই
মুখার্জী সাহেব বাচ্চাটির নামে একটা ব্যাঙ্ক একাউন্ট করে দিয়ে তাতে বাচ্চাটির নামে বেশ কিছু টাকা ডিপোজিট করে দিয়েছিলেন।
ঘটনাটির শেষ অংশে জানিয়ে দিতে চাই আর একটি মর্মান্তিক ঘটনা---
এই মুখার্জি সাহেব -------
পরে বেশ কিছুদিন পরে একদিন মুখার্জী সাহেব নিজের মোটর বাইকে ধানবাদ থেকে আসানসোল যাবার সময় এক লরির সাথে এক্সিডেন্ট করে ।
এবং সেই এক্সিডেন্টের কারনে ওনার মাথায় ভীষণ আঘাত লাগে এবং ধানবাদ হস্পিটাল ওনাকে রেফার করে কোলকাতার EMRI হস্পিটালে।
ওখানে প্রায় এক মাস চেস্টা করেও ডাক্তাররা ওনাকে বাঁচাতে পারেন নি।
মুখার্জি সাহেব সকলের প্রিয় এবং সত্যি কারের এক জন সমাজ সেবি ছিলেন।
ওনার মৃত্যুতে আমরা সকলেই ভীষণ দুঃখ পেয়ে ছিলাম, এবং আজও মাজে মাজে ওনার কথা মনে পরে ।
এর পরে আমি 2010 এতে চাকুরী থেকে
অবসর নিয়ে কোলকাতায় চলে আসি।
2012 তে একদিন গেলাম ধানবাদে সকলের সাথে দেখা করতে।
সেই দেখা করার সুবাদে হরিপদ বাবুর সাথে দেখা করতে গিয়ে ছিলাম। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম হরিপদ বাবু ও তার তিনটি বাচ্চাকেই গিরিজি নিয়ে গেছেন বেনারসে । বেনারসে গিরিজির নিজের বাড়ি আছে ,সেখানেই হরিপদ বাবু থাকেন ওই বাড়ির কেয়ার টাকার হিসবে।
আর ওনার ওই বাচ্ছা তিনটিকে ওখানকার স্কুলে ভর্তি করে ওদের লেখা পড়ার সকল দায়িত্য নিয়ে নিয়েছেন গিরিজি।
গিরিজি দিল্লি থেকে মাঝে মাঝে আসেন বেনারস।
সেদিন 10 সেপ্টেম্বর 2018 হঠাৎ গিরিজির ফোন পেলাম।
গিরিজি জানালেন যে গিরিজি নিজের বাড়ির একটি অংশ হরিপদ বাবুর নামে লিখে দিয়ে রেজিস্ট্রি করে দিলেন।
যাতে করে হরিপদ বাবুর জীবন ভালোভাবে চলে যায়, ঘরগুলো ভাড়া দিয়ে।
আজ10 সেপ্টেম্বর 2020 হঠাৎ ফোনে গিরিজির মৃত্যু সংবাদ জানালেন হরিপদ বাবু।
জানালেন কএক দিন আগে জিরিজি বেনারসে এসে বুকে ব্যথার কারনে অসুস্থ হয়ে হস্পিটালে ভর্তি ছিলেন।
আর ঠিক 10 তারিখে ওনার জন্ম দিনের ভোর সাড়ে চারটার (4:30 am ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
সত্যি মহান কিছু মানুষ জন্মদিনেই চলেযান ইহলোক ছেড়ে।
ওনাদের জন্মদিন সত্যি সার্থক জন্ম দিন।
<--©➽-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
12/09/2020; সকাল 6:15am
==========================
Comments
Post a Comment