626>||--দাদু ভাই--||

  626>||--দাদু ভাই--|| 

               15/05/2024

            <---আদ্যনাথ-->

দাদু ভাই, দাদুভাই দুবার ডাক শুনেই আমরা ছুটে যেতাম উঠোনে, মা ও আসতেন আমাদের সাথে।

উনি আসলেই প্রথমেই আমরা জানতে চাইতাম কোথা থেকে আসছো বাজার, দোকান, কোথায় কি হোল,মা জানতে চায় অনিমারা (আমাদের মাসি) কেমন আছে এবং একটু গল্প শুনতে চাইতাম আমরা ওনার কাছে।


হিন্দিমিশ্রিত বাংলায় কথা বলতো। কত গল্পই না জানতো। কি সুন্দর করে বলতো।

হ্যা এই দাদুভাই আর কেউনয় একজন মহিলা ভিখারিনী রূপেই সকলের  কাছে পরিচিত। তবুও আমরা কোনদিন ওনাকে

ভিখারি বলে ভাবতাম না, আমরা ভাবতাম উনি আমাদের মা এর কোন জানাশোনা বা আত্মীয়।

সম্ভবত তিনি বাঙালি ছিলেন না।

এখন বুঝতে পারি যতদূর মনেপরে ওনার কথা বলার টানে তিনি বিহার বিশেষত ছাপড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এমনিতে মনেহবে তিনি ভিক্ষা কোরতেই আসতেন।

এই ভিক্ষা বৃত্তির আড়ালে তিনি এপাড়া সেপাড়া ঘুরতেন ও আশেপাশে মা,মাসি দের ও ছেলে মেয়েদের খবরাখবর দিতেন। বেলঘড়িয়া থেকে আগরপাড়া, সোদপুর, আড়িয়াদহ,দক্ষিণেশ্বর এই বিস্তীর্ণ এলাকায় উনি ঘুরে বেড়াতেন, এবং এই সকল এলাকায় কার কোন আত্মীয় কোথায় কে থাকেন সে গুলি তার নখ দর্পণে রেখেছিলেন, ফলে সকলের খবর সকলকে আদান প্রদান করতেন। এমনটাই তার বিচিত্র স্বভাব।


সে সময়ে তো আর মোবাইল বা টেলিফোন ছিলোনা,ফলে মা মাসিরা ভীষণ খুশি হতেন এই দাদু ভাই আসলে। আমরাও খুশি হোতাম রোজ নুতন নুতন গল্প শুনতে পাওয়ার কারণে । ওনার গল্প মানে রোজ যা খবর উনি জোগাড় করতেন সেগুলিকে ই সুন্দর করে বলতে পারতেন। এটা তার এক বিশেষ গুন। অতি সাধারন কথা গুলো এমন সুন্দর করে বলতে পারতেন যা শুনে সকলেই আনন্দ পেতাম। ওনার এই বলার ক্ষমতা ,তখন তো ছোট ছিলাম তাই খেয়াল করিনি। আজ যখন মনে পড়ে সেই কথা এখন বুঝতে পারি  উনি কি অসম্ভব ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। যেমন হয়তো মা জিজ্ঞাসা করলেন কিগো দাদু ভাই সরলা ( মানে আমার মাসি যিনি আগের পাড়ার দেশপ্রিয় নগরে থাকতেন) কেমন আছে।


উনি বলতেই পারতেন যে সরলা দিদি ভালো আছে। না উনি তেমন ভাবে বলতেন না উনি খুব ভালো করে নানান কথা জুড়ে এমন গল্প করে এই সামান্য সংবাদ টুকু দিতেন যা আজ ভাবলে অবাক হয়ে যাই। ওনার এমন সুন্দর বাচন ভঙ্গি যা মনেরাখার মতন।

আজ ভাবতে বাধ্য হই যে এই সামান্য একজন বিহারী দরিদ্র মহিলা যে সমস্ত দিন ঘুরে বেড়াতেন বাড়ি বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম পাড়ায় পাড়ায় এবং এভাবে সমস্ত দিন অক্লান্ত পিরিশ্রম করে সকল বাড়ির মা বোনদের ও আমাদের মতন ছোটদের কথা ও গল্প বলে সকলকেই সন্তুষ্ট করতেন। এবং সকলেই উনি আবার কবে আসবেন সেই সংবাদের জন্য পথ চেয়ে থাকতেন।

কথা বলার কি অপূর্ব সুন্দর ওনার ক্ষমতা সেই কথা চিন্তা করে আজও বিস্মিত হই।

উনি একবার আমার মায়ের কাছে আবদার করলেন চারটি জামা প্যান্টের। মা আদর করে আমাদের ভাল ভাল জামাপ্যান্ট গুলি দিয়ে দিলেন। আমরা প্রতিবাদ করতে পারলাম না, কারন দাদু ভাইকে দিচ্ছে, যিনি আমাদেরও ভালো লাগার একজন। আমার মনে একটু খটকা লাগলো, তাই জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি এই জামাপ্যান্ট নিয়ে কি করবে। তিনি বলেছিলেন তোমাদের মতন আমার ঘরেও তিনটি দাদুভাই আছে। কিকরি বোলো নুতন জামাপ্যান্ট কোথায় পাবো, তাই তোমাদের গুলোই ওদের দেবো। আমি বললাম না না এগুলি পুরোনো জামা নয়। একদম নুতন , একদিনও আমি পড়িনি।


সে যাইহোক উনি সেগুলি আদর করে গুছিয়ে নিজের পোটলাতে রাখলেন।

ওনার পোটলাতে আরও জামা প্যান্ট ছিলো , যেগুলো দেখে আমার মনে একটু খটকা লেগেছিলো।


সেদিনের পরে বহু দিন ওনার দেখা পাইনি। একদিন মা কে জিজ্ঞাসা করলাম দাদুভাই কেন আসে না।

মায়ের সোজা উত্তর ,হয়তো আজকাল অন্যকোন দিগে যাচ্ছে । তাই এইদিগে আসার সময় পায়না।  

আমিও ভাবলাম মা হয়তো ঠিকই বলছে ,সেই কারনে আর কোন কথা বলিনি। 


এর বেশ কিছুদিন বাদে শুনে ছিলাম যে দাদুভাই  ফের একদিন এসে ছিলেন। তখন আমি স্কুলেছিলাম তাই দেখা হয় নি।

 মনে হয় এর ঠিক কয়েক মাস বাদে আমি সোদপুরের নাটাগড়ে এক আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের কাছে গিয়ে ছিলাম। 

আমার দিদিমার জন্য একটি ঔষধ আনতে।  নাটাগড়ে গিয়ে জানলাম দিদিমার পরিচিত সেই বিশেষ ডাক্তার ( ধন্বন্তরী ) অনেক দিন আগেই দেহ  রেখেছেন আর এখন যিনি ওখানে বসেন তিনি আমার দিদিমাকে চিনতে নাপাড়ায়

ঔষধ আর নেওয়া হল না। 

আমি কি আর করি অগত্যা বাড়ি ফিরতে হবে , নাটাগড় থেকে হাঁটাপথে সোদপুর স্টেশনের দিকে আসছিলাম ,হঠাৎ দূরে মনে হল  সেই দাদুভাই একটা গলিতে ঢুকলো। ঠিক দাদুভাইয়ের মতন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটা হাতে লাঠি। কাঁধে সেই সাদা ধুতির  ঝোলা, পরণে মলিন সাদা ধুতি, মাথার ঘোমটার মত করে ধুতির একটি অংশ। আমি ভাবলাম উনি এখানে এই সন্ধে বেলায় কার বাড়িতে যাচ্ছেন, আমি ভুল দেখলাম নাতো! মনে একটু কৌতূহল নিয়ে তাড়াতাড়ি হেটে ওনার কাছে যাবার জন্য এগিয়ে চললাম। আমি তখন বেশ কিছুটা দূরে , দূরথেকেই দেখতে পেলাম উনি এগিয়ে যাচ্ছিলো ,হঠাৎ একটি ছেলে, আমার বয়সী হবে,  ছেলেটি এসে দাদুভাইয়ের কাঁধ থেকে ঝোলাটা নিজের কাঁধে নিয়ে দাদু ভাইয়ের সাথে হেটে চলতে লাগলো। এমন ঘটনাটা আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল ,এবং আমি ওদের পিছনে পিছনে চললাম। বেশ খানিকটা যাবার পরে  দেখি  ওরা  একটা ঘড়ে ঢুকলো। 

ঘরটা বেড়ার ,চালটা খড়ের। ঠিক আমাদের বাড়ির মতন ,তবে আমাদের বাড়ির মতন অত বড় ঘড় না.(সেই সময়ে আমাদের ঘরও বাঁশের দরমার দেওয়া ঘর খড়ের ছাউনি। মাটির বারান্দা ছিল,)

 থাক সে কথা ---

আমি চুপচাপ ওদের পেছনে পেছনে  ওদের বাড়িতে ঢুকলাম। 

কি অদ্ভুত দাদু ভাই ঠিক আমাকে চিনতে পেরেছে। এবং চিনতে পেরে ভীষণ অস্থির হয়ে উঠল, তাড়াতাড়ি  আমাকে এখানে আসার কারন জিজ্ঞাসা করেই বললো আমি বাড়িতে বলেএসেছি কিনা, নাকি আমি বাড়িথেকে পালিয়ে এসেছি !

এমন হাজারটা কৈফিয়ৎ ও তার জবাব দিতে দিতে আমি অস্থির।

শেষে যখন ওই নাটাগরের  ধন্বন্তরী ও দিদিমার ঔষদের কথা বললাম তখন উনি কিছুটা শান্ত হলেন এবং তিনি আবার 

অস্থির হয়ে উঠলো যেন আমি ওদের কত আপন , কি করে কি খাওয়াবে কোথায় বসাবেন এইসকল নিয়ে দাদুভাই অস্থির হয়ে উঠল। এরই মধ্যে দেখি আরও দুটি ছেলে এসে হাজির, দুজনেই খুব ছোট। আমি অনেক করে ওনাকে বুঝিয়ে বললাম আমার আসার কারন। 

তারপরে আমি জিজ্ঞাসা করলাম ওই ছেলে তিনটির ব্যাপারে।  দাদুভাই কোন রকম দ্বিধা নাকরে বললো এড়াইতো আমার ছেলে। এইযে ●অরুন মানে  বড়ো  ছেলে ক্লাস এইটে পড়ে , ●বরুন মানে মেজ ক্লাস ফাইভে পড়ে। আর এই 

ছোটাবাবু ওর নাম ●তপন, ক্লাস থ্রিতে পড়ে। তারপরে দাদুভাই বললো যে উনি ওদের জন্যই জামা প্যান্ট জোগাড় করে। 


এর পরের কাহিনী শুনে আমি দাদুভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধায় চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। 

এবারে পুরো ঘটনা বলছি -----


এই স্ত্রী মানুষটি অর্থাৎ আমাদের দাদুভাই এই সকল ছেলেদের কোথাও না কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছেন । 

তারপরে নিজে কোলে পিঠে করে অনেক যত্নে এদের  মানুষ করেছেন। আর শুধু এরাই নয় এর আগেও আরো দুইটি ছেলেকে এমনি ভাবেই বড় করেছেন। যার বড় জনের নাম সত্যেন।

আর পরের জনের নাম জিতেন।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা সেই সত্যেন কোথায় আর জিতেন ওরা কোথায় আর তুমি এতো কষ্ট করেও ওদের লেখা পড়া শিখাচ্ছ। 

দাদুভাই আমার কথায় খানিকটা উদাস চোখে দূরের  দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো এবং বললেন যে ওনার বাড়ি বিহারের সরন তথা  ছাপড়া জেলার কোন এক  গ্রামের পাড়াগাঁয়ে, সেই পাড়াগাঁয়ের নাম    উনি বলেছিলেন কিন্তু আমি আর মনে করতে পারিনি।  ছোট বেলাতেই মা কে হারিয়ে বাবার সঙ্গেই থাকতো। 

উনি বলছিলেন ওনার বাবা কোন এক দোকানে কাজ করেন। বাবা যে দোকানে কাজ করেন তারা গ্রামের মেলায় দোকান বসায়। বাবা সেই দোকানে মিষ্টি, গজা, নিমকি,জিলিপি ইত্যাদি বানান।

এবার ওনার মুখের কথাতেই বলছি-----

"মা মারা যাবার পরে ঘরে একলা কি  করে থাকবো তাই  বাবার সাথে আমিও গিয়ে ছিলাম। তখন বোধহয় আমার বয়স পাঁচ কি ছয় বছর হবে। তিন দিন চলেছিল সেই মেলা। তিনদিন পরে মেলার শেষে সেদিন রাত্রে বাড়ি ফেরার সময় পথে হঠাৎ ভীষণ ঝড় উঠলো সাথে ভীষণ বৃষ্টি। বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে চলছিলেন। গ্রামের অন্ধকার পথে জল ঝড়ে  মাটির রাস্তা ,ধানক্ষেতের আল ধরে হাটা পথ। হঠাৎ হঠাৎ ভীষণ ভাবে বাজ পড়ছিলো ও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল  আমাদের সব জামাকাপড় ব্যাগ বাবার ছোট ব্যাগে রাখা টাকা পয়সা সব ভিজে একাকার। হঠাৎ কি করে কি হোল বাবার  পাপিছলে পরেগিয়ে অজ্ঞান হয়ে  গেলেন।

অন্ধকার রাত, বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল।

তার উপরে  ভীষণ ভাবে বিদ্যুতের চমক সাথে ভীষণ মেঘের গর্জন, আমি ভয়ে বাবাকে জড়িয়ে কাঁদছিলাম। জলে কাঁদায় মাখা মাখি হয়ে কতক্ষন কেঁদেছিলাম জানিনা।

অন্ধকারে ভয় পেয়ে কখন যে জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম সেটাও  জানিনা। আমার যখন জ্ঞান ফিরেলো  তখন আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। 

আমি এখানে এই হাসপাতালে কি করে এসেছি কারাইবা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে কিছুই জানতে পারিনি। 

জ্ঞান ফিরতেই বাবার খোঁজ করছিলাম , কিন্তু হাসপাতালের কেউই কিছু বলতে পালনা। 

আমি বাবার জন্য খুব কাদঁতাম। কিন্তু বাবার কোন খোঁজ পাইনি। কয়েক দিন পরে আমাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছিলো ,তবে বাঁ-পায়ে প্লাস্টার ছিল। 


জেনেছিলাম আমার বাঁ পায়ের হাড় ভেঙে গিয়ে ছিল। সম্ভবত বাবা যখন পরে গিয়ে ছিলেন  তখন আমি বাবার কাঁধ থেকে বেকায়দাতে পড়েযাওয়ার ফলে বাঁ পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিলো।  কিন্তু আমি আজও জানতে পারিনি কে বা কারা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করেছিল ,এবং আমার বাবার কি হয়েছিল বা বাবা কোথায় গেলেন ,এইসকল কোন খবরই আমি আজ অবধি পাইনি। 

তবে হ্যাঁ ওই হাসপাতালের এক মালি আমাকে নিয়ে ওনার ঘরে রেখে ছিলেন। 

ওই মালির আপন বলতে কেউ ছিলোনা তাই উনি আমাকে নিজের মেয়ের মতন খুব আদর যত্নে রেখেছিলেন। 


পায়ের প্লাস্টার কাটার পরে ধীরে ধীরে আমি ওনার বাড়ির সব কাজ কর্ম করতাম। এভাবে আমি একটু বরো হতে একদিন কাউকে কিছু না বলে বাসে চড়ে নিজের বাড়ির উদ্দ্যেশে রওনা দিয়ে ছিলাম। কিন্তু বাস ভাড়া দিতে না পাড়ার জন্য আমাকে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে ছিল।" 

আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম সে নাহয় বুঝলাম কিন্তু তুমি সেই ছাপড়া থেকে এই সোদপুরে কিকরে আসলে?

দাদুভাই আবার কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো

" সে অনেক কথা দিল্লি হয়ে বর্ধমান হয়ে এসে পৌঁছেছি এই সোদপুরের এই নাটাগরে।"

আমিও জিদ ধরে বসলাম যে আজ পুরো ঘটনা শুনে তবেই বাড়ি ফিরবো। তা না হলে বাড়ি ফিরবোই না।

আমার এমন কথা শুনে দাদুভাই অনেক অনুরোধ করলেন আমাকে বাড়ি ফিরে যাবার জন্য।

আমিও জানি যে উনি যেকোন ছেলে মেয়েকে ভীষণ ভালো বসেন।

আমি বাড়ি ফিরবোনা এমন কথা বলতেই উনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে বার বার আমাকে অনুরোধ করলেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাবার জন্য।  

ততক্ষনে অরুণ বোধ হয় বাজার থেকে কলা মুড়ি কিনে এনে আমাকে দিলো।

ওরাও সকলে এক এক বাটি করে মুড়ি নিয়ে বসলো।

সুধু কলা দিয়ে মুড়ি খেতে আমার বেশ অসুবিধা হচ্ছিল তাই বরুণ খানিকটা জল দিয়ে বললো মুড়ি জলদিয়ে ভিজিয়ে কলা দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগবে। আমিও সেই মতম মুড়ি মেখে কলা দিয়ে খেলাম।

সত্যি বেশ ভালোই লেগেছিল সেদিনের সেই মুড়ি কলা। এদিকে আমি যখন কোন ভাবেই বাড়ি ফিরবোনা এমন কথা শোনার পর দাদুভাই বাধ্য হয়ে বললেন।

" তবে শোন আমার সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা। মানুষ যে কতটা অসৎ নীচ ও লোভী হতে পারে সে কথা বাবা তোমরা ভাবতেও পারবে না। সেদিন ছাপড়া শহরের বাস থেকে পথের মাঝে আমাকে নামিয়ে দিলে আমি ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম। মাঝ রাস্থায় প্রচন্ড রোদের বেলায়, ভীষণ গরম ও প্রচন্ড রোদের তেজ। হাত মুখ জ্বলে যাচ্ছিল। ভীষণ জল তেষ্টা ও খিদে পেয়েছে বুঝলাম। কিন্তু কি করি কোথায় যাই , কে বলেদেবে আমার বাড়ি কোথায় কতদূর! আমি দিশে হারা হয়ে পথের মাঝে বসে ভাবছিলাম কোথায় যাবো, কিকিরে যাবো।

আমিতো আমার বাড়ির ঠিকানাও জানিনা। এমনি ভাবতে ভাবতে অনেক্ষন পার হয়ে গেল। হঠাৎ কোথা থেকে একজন মোটর সাইকেল আলা আমাকে দেখে  বললেন ' এই খুকি ইহা বৈঠকের কেয়া কর রাহি হায়।'  আমি আমার দুঃখের কথা তাকে শুনিয়ে গ্রামের বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য অনুনয় বিনয় করতে লাগলাম। মোটর সাইকেল আলা আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন যে উনি আমাকে আমার বাড়িতে পৌঁছে দেবন ও আমার বাবাকে খুঁজে দেবেন।  আমিও ওনাকে বিশ্বাস করে ওনার গাড়িতে চড়ে ছিলাম।

উনি অনেক রাস্থা ঘুরিয়ে শেষে সন্ধের পরে একটি বাড়িতে নিয়ে গেল আমাকে। সেখানে এক বুড়িমা  আমাকে বেশ আদর করে খাবার দিলো।

সেখানে আমার মতন আরো একজন ও আমার থেকে ছোটো আরো দুইজন ছিলো। সেদিন রাত্রে খাবার পরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।  হঠাৎ জখম ঘুম ভাঙলো তখন বুঝতে পারলাম আমি ও আরও পাঁচটি মেয়ে ট্রাকে ঘুমোছিলাম। কিভাবে ট্রাকে উঠলাম, কে আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, এখান থেকে পালাবার কোন উপায় নাই কারন আমাদের সকলের হাত পা বাঁধা। আর লরিটাও খুব জোরে চলছিলো ।

লরির ভিতরে আমি ছাড়া কারুরই ঘুম ভাঙেনি।  ঘুম ভাঙলেও সমস্ত শরীরে ব্যাথা, ঝিমুনি ভাব, একটুও নরা চড়া  করতে পারছি না। এইভাবে কতক্ষন ট্রাকে ছিলাম, বা কোথায় যাচ্ছি  কিছুই জানিনা,

যখন ট্রাক টা থামলো তখন অনেক রাত্রি হয়ে গেছে। ভীষণ খিদে পেয়েছিলো, সারাদিন একটুও জলও দেয়নি। এবার কিছু লোক মিলে আমাদের সকল কে নামলো,

সবার সঙ্গে আমিও ঘুমের ভান করে চুপ করে শুয়ে রইলাম। বুঝলাম আমাকে ট্রাক থেকে নামিয়ে  একটি ঘরের ভিতরে শুয়ে রাখলো।  একটু হালকা করে চোখ খুলে বুঝতে চেষ্টা করলাম । কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না বা অন্য মেয়ে গুলি কোথায় তাও বুঝতে পারলাম না।  অনেক্ষন হয়ে গেছে কারুর কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে চোখ খুলাম, খিদের জ্বালা টা এবার একটু কম মনে হছিলো। কিন্তু শরীর অবস। কোন জোর ই পাচ্ছিলাম না।  হঠাৎ চোখে মুখে জল পড়তে আঃ বলে কুঁ- কীয়ে উঠতেই দেখলাম একটি মোটা সোটা লোক আমার হাতের দড়ি খুলে দিয়ে বললো নে এই রুটি গুলো খেয়ে নে।

খিদের জ্বালায় আমি পাউরুটি গুলো জল দিয়েই খেয়ে নিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞাস করলাম আমি কোথাও এবং উনি কে।

লোকটি ধমক দিয়ে আমাকে চুপ থাকতে বলে ঘরটি বন্ধ করে চলে গেল।

আমি বেশ অনেক্ষন চুপ চাপ বসে থেকে উঠে দাঁড়ালাম। তার পরে ভালোকরে দেখে শুনে বুঝতে পারলাম যে এটা মাটির নিচে একটি ঘর। কিন্তু আর মেয়ে গুলি কোথায় তা বুঝতে পারলাম না। এখানে তিন চারটি ঘর, সব গুলোই বস্থা ভর্তি ভর্তি কি যেন রাখা আছে। একটি ঘরের দরজা খোলা ছিলো, আমি সেই ঘরে ঢুকে বস্তা য় কি আছে দেখতে গিয়ে বুঝলাম বাচ্চাদের খাবার দুধের কৌটোর মতন অনের কৌটো। কিন্তু ওতে কি আছে বুঝতে পারিনি। একটা কৌটো দেখা যাচ্ছিলো কিন্তু আমি তো লেখা পড়া জানতাম না তাই ইংরেজি পড়তেও পারিনি তাই জানতেও পারিনি কি আছে ওই সব কৌটো তে।  হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম লাইট নিভিয়ে দিয়েছে।

তারপরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা। এখানে কখন সকাল কখন রাত্রি কিছুই বোঝার উপায় নাই। এমনি করেই কাটলো বোধ হয় কয়েকটা দিন।

রোজই পাউরুটি আর তরকারি বা ডাল দিতো তাও মাত্র দুই বার।

কতদিন ছিলাম ওখানে তা জানিনা।

একদিন দুটি লোক এসে একজন আমাকে বলল চল তোকে পৌঁছে দিয়ে আসি তোর বাড়িতে।

(ওরা দুজন ছিল একজন বয়স্ক আর একজন অনেক ছোট রোগা পাতলা।)


আমি অবাক হলাম। এমন সময় বয়স্ক লোকটি তার  সাথের লোকটিকে বললো মুন্না লেরকি কি আঁখমে পট্টি বাঁধ দো।

মুন্না নামের ছেলেটি আমার চোখ বেঁধে দিলো একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে।

তারপর ওরা আমাকে অনেকটা পথ হাঁটিয়ে মনেহল একটা খাঁচার করে টেনে উপরে উঠালো। তারপরে আবার খানিকটা মনেহল জঙ্গলের পথ হাঁটিয়ে একটা মোটর গাড়িতে বসিয়ে নিয়ে চললো। মুন্না নামের ছেলেটিই গাড়িটি চালাচ্ছিল। বেশ অনেক দূর যাবার পরে আমার চোখ খুলে দিয়ে অনেক্ষণ গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গিয়ে পরে  রেল গাড়িতে চাপিয়ে কোথাও নিয়ে যাচ্ছিল।

আমিতো পড়াই লিখাই জানতাম না সেই কারণে সেটা কোন স্টেশন বুঝতে পারিনি।

রেল গাড়িতে অনেক ভিড় ছিলো, যেতে যেতে রাত্রি হয়ে গেলে অনেক রাত্রে বুঝলাম সঙ্গের লোকটি ঘুমিয়ে পড়েছে,

এমন সময় একটি স্টেশনে গাড়ি থামলে আমি চুপ চাপ গাড়ি থেকে নেবে গিয়ে দৌড়ে স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে একটা বন্ধ দোকানের পাশে গিয়ে লুকিয়ে থাকলাম। সকাল হলে সেখানে থেকে বেরিয়ে স্টেশনে এসে একটা রেল গাড়িতে চড়ে লুকিয়ে থাকলাম বসার সিটের নীচে।

গাড়িতে অনেক ভিড় ছিল। আমি অনেক কষ্টে লুকিয়ে থাকলাম। তার পরে যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা , ঘুম ভাঙতে লোকের কথায় বুঝে ছিলাম মুগলসরাই স্টেশনে পৌঁছে গেছি, সেই ট্রেনেই পরের দিন শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে গিয়ে ছিলাম।  এতো লোকের ভিড় দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে স্টেশনের এক দোকানের কোনায় লুকিয়ে ছিলাম। তারপরে কিকরে কি হয়েছিলো মনে নাই। যে টুকু মনে আছে যে এই সোদপুর স্টেশনের কাছে এই নাটাগরে এক বুড়িমার সাথে থাকতাম। পরে শুনেছিলাম বুড়িমা আমাকে শিয়ালদা স্টেশন থেকে নিয়ে এসে রেখেছিলেন ওনার বাড়িতে।

একটু ছোট ঝুপড়ি ছাড়া বুড়িমায়ের আর কিছুই ছিলনা। সেই ঝুপরিতেই থাকতাম আমি আর বুড়ি মা। একসময়ে পেটের তাগিদে আমরা দুজনেই ভিক্ষা করতাম, তারপরে একদিন বুরিমা অসুস্থ হয়ে প্রায় ছয় মাস বিছনায় ছিলেন, তখন আমি একাই ভিক্ষা করে ওনার সেবা শশ্রুষা করতাম। একদিন উনিও মারা পরলেন।

তারপর থেকে আমিও একা হয়ে গেলাম।

অনেক অত্যাচার নানান সমস্যার কাটিয়ে সেই ঝুপড়ি টিকে একটি এই দোচালার ঘর করতে পেরেছি লোকাল থানা ও মিউনিসিপালিটির কিছু মানুষের সহায়তায়। সে দিনের সে অনেক গল্প।


তবে সেই বহু বছর থেকেই সোদপুর, আগরপাড়া বেলঘড়িয়ার গ্রামে গ্রামে ঘুরে সকল বাড়ির খবরাখবর দেওয়া নেওয়া করে চলছিলাম।

মনে আছে সেদিন ভীষণ জল ঝড়ের সন্ধ্যা সেই সোদপুরের বাস রাস্থা পারকরে মাঠের পাশ দিয়ে ফিরছিলাম  হঠাৎ 

দেখি একটি  চার / পাঁচ বছরের একটি ছেলে এক চায়ের দোকানের পেছনে বসে বৃষ্টিতে ভিজে শীতে কাঁপছে।

ওর কাছে দিয়ে ওকে কোলে নিয়ে এক দোকানে ঢুকে দাঁড়ালাম। দোকানদার আমাকে দেখে বললো " কি দাদু ভাই ওকে তুমি চেনো নাকি?"

আমি বলল না গো ওকে তো চিনিনা কোন বাড়ির তাও মনে করতে পারছিনা।

দোকানি বললো  তুমি যখন চিনতে পারছো না তবে বেশ মুস্কিলের।

আমি তো ওকে সেই সকাল থেকে দেখেছি ওখানে বসে ভিজছে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম এইটুকু ছেলে সকাল থেকে ওখানে বসে ভিজছে আর আপনি দেখেও কিছু করেননি। দোকানি বলেছিল কার না কার ছেলে নিয়ে কিছু খাওয়াতে চাইলে যদি কিছু হয়ে যায় তবে কে দায়ী হবে।

বুঝলাম বাচ্চাটি কাঁদতেও পারছে না  ভাবলাম বোধহয় বোবা ছেলে। মুখদিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। আসলে বৃষ্টিতে ভিজে ও ভয়ে ও কিছুই বলতে পারছিলো না।

আমি এতক্ষন দোকানির উননের সামনে ওকে রেখে ছিলাম তাই এখন ওকে কাঁপুনি একটু কমেছে। তারপরে বৃষ্টি একটু কমতেই খানিকটা দুধ কিনে খাইয়ে ওকে নিয়ে ওর নাম জিজ্ঞাসা করতে ও শুধু আমতা আমতা করে বললো খোকা।

বৃষ্টি পুরোপুরি থামতেই আমি খোকাকে  সোজা থানায় নিয়ে গিয়ে বড়ো বাবুকে সব বলতেই বড়বাবু চিন্তায় পরলেন যে বাচ্চা টিকে কোথায় কিভাবে রাখবেন।

তখন আমি ওকে আমার কাছে রাখতে চাইলাম। বড়বাবু একটু চিন্তা করে মেজ বাবুকে ডেকে ফটো বাবুকে দিয়ে ফটো তুলে খবরের কাগজে দিয়ে দিতে বললেন।


সেদিন ওর আর আমার ফটো তুলে অনেক কিছু লেখা পড়া করে বড়বাবু আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন যতদিন ছেলেটির বাবা মা অথবা কেউ বাচ্চাটির কে নিতে না আসে ততদিন আমি যেন বাচ্চাটিকে দেখাশুনা করি ।

বড়োবাবু সেদিন আমাকে কিছু টাকা দিয়ে বললেন ওকে একটু দুধ কিনে খাওয়াস।

আমি কিছুতেই টাকা নিতে চাইনি কিন্তু উনি জোর করে 200 টাকা দিয়ে বলেছিলেন, যখন যা দরকার হবে আমার কাছ থেকে বা এই মেজ বাবুর থেকে নিয়ে জাস। বড় বাবাবুই ওর নাম দিয়েছিলেন সত্যেন।  তারপরে কোনদিন ওর খায়াবার বা জামা কাপড়ের কোন অসুবুধা হয়নি।

তোমাদের সকলের বাড়িথেকে চেয়ে চিন্তেই সত্যেন কে  বড় করে তুলেছিলাম। ও জখন মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছিল ঠিক তখনই জিতেনকে পেয়েছিলাম ওই 

আগরপাড়ার রেল লাইনের ধারে। 

কেজেন ফেলে রেখে গিয়ে ছিল

সদ্যজাত শিশুটি কে। জিতেনের নাম আমিই রেখেছি। জিতেন এখন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের ইস্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ে।"

আমি জিজ্ঞাসা করলাম আর সত্যেন এখন কোথায়?

উনি জবাব দিলো সে আবার এক অনেক ঘটনা পরে একদিন বলবো । তবে সত্যেন এখন আর জি করের ডাক্তার ও ওর বাবা মায়ের সাথে থাকে চন্দননগরে।

মাঝে মাঝে আসে এখানে। এইতো সেদিন এসে ছিলো ঘরের চালে নুতন করে খড় লাগিয়ে গেল যাতে বর্ষায় জল না পড়ে।

মাঝে মধ্যে ওর বাবা মা ও আসেন দেখা করতে। এইতো কিছুদিন আগে বরুণের ভিষিন জ্বর টাইফয়েডের মতন হয়ে ছিলো।

সত্যেন এসে ওকে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে রেখে ওর চিকিৎসা করে ঠিক করে পাঠিয়ে দিয়েছে। সত্যেনের বাবাই নিজের গাড়ি করে বরুণ কে পৌঁছে দিয়ে গেছেন।

এবার বলো তুমি আর কি জানতে চাও।"


আমি এতক্ষন অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে শুনছিলাম দাদুভাইয়ের কথা, এ যেন এক রূপ কথার থেকেও রোমান্টিক এক  ঘটনা।

আমিতো আজও ভাবতে পারিনা সেই তথাকথিত অশিক্ষিত বিহারের অজ 

পারাগ্রামের এক মেয়ে আজও এমন ভাবে অনাথ শিশুদের কোলে পীঠে করে গড়ে তুলছে, সত্যেনের মতন ছেলেকে সমাজের উচ্ছ আসনে বসাতে পেরেছে।

জিতেন নামক ছেলেটিকে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম ইস্কুলে ভর্তি করতে পেরেছে।

নিজে গর্ভধারিনী মা হতে পারেন নি,

তাতে কি এতো গুলি ছেলের প্রকৃত মা তো হয়েছেন। একি কম কথা ! এর থেকে বেশি কি আর জানতে চাইবো ওনার কাছে!

মনে হচ্ছে ওনার পা ছুয়ে একবার প্রনাম করি। কিন্তু তা করতে পারিনি কারন অহঙ্কার আমি ব্রহ্মণ পৈতে আছে গলায় আমি কি করে ওনার পা ছুঁতে পারি।

সমাজ কি বলবে।

সে সমাজ যাই বলুক প্রত্যক্ষ প্রনাম না করতে পারলেও মনে মনে এমন মহান হৃদয়ের এক মা কে  সাষ্টাঙ্গে প্রনাম জানাই হৃদয়ের অন্তর থেকে।

আজ আমি যখন এই ঘটনা লিখছি তখন হয়তো সেই মহান হৃদয়ের মা আমাদের প্রিয় দাদুভাই আর নাই। এমন বলার কারন এটাই যে আজ আমারই বয়স এখন 74 প্রায় তা উনি আমার থেকে অন্তত  40 বৎসর বেশি ছিলেন বলেই মনে হয়।

সেই হিসাবে ওনার না থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে আশা করি সত্যেন, জিতেন, অরুণ,বরুণ,তপন নিশ্চই এখনো আছে।

তাই ভাবছি একদিন সময় করে যাবো ওদের খোঁজ করতে।

আর কারুর খোঁজ পাই আর না পাই সত্যেন ও জিতেনের খোঁজ তো পেতেই পারি। 

     <-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->

                    15/05/2024

===========================

Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

627>এক বর্ষার রাত::-