627>এক বর্ষার রাত::-

       627>এক বর্ষার রাত::-

      ছোটগল্প::--(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

                    25/08/2024

              <---আদ্যনাথ---->

এক বর্ষার রাত::---

মধ্যপ্রদেশের বিলাস জেলার  কোরবা অঞ্চলের যাবার রস্থায়, জঙ্গলের ভেতরে চলছিলাম একলা শুনেছি ওখানে এক অতি প্রাচীন সুন্দর মন্দির আছে, সেটি দেখবার জন্যই যাচ্ছিলাম । সুরাগাছার নামক জায়গায় ভীষণ ঘন জঙ্গলের মধ্যদিয়ে যাবার সময় হঠাৎ বৃষ্টি, বেশ জোরেই নামলো ঝম-ঝিমিয়ে। 

এমনিতেই বিকেলের আলো বেশ কম,তার ওপরে জঙ্গল এলাকায় বিকেল মানেই রাত্রির অন্ধকার , এখন তো তার ওপরে আবার বৃষ্টি ,সেই কারণে বেশ ঘন অন্ধকার। বোধহয় রাত ভর ভিজতে হবে !

এছাড়া আর কোন উপায়ও নাই।

মনেহচ্ছিলো না আসলেই ভালো হতো।

কিন্তু মনের জেদ , মন্দিরটি দেখতেই হবে।

একদিনের ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।

অগত্যা প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই চলছি,

জামা জুতো ভিজে একাকার।

একটু এগোতেই দেখি একটি কুঁড়ে ঘর। এইটুকুতেই যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ চিন্তা করে ঢুকে পড়লাম ঘরে। খোলা বারান্দায় টিনের ছাউনি। অন্তত বৃষ্টি থেকে মাথা গোজার জায়গা পেয়ে বেশ ভালো লাগলো। মনে মনে ঈশ্বরকে একবার প্রণাম করে নিয়ে দরমার বেড়ায় হেলান দিয়ে মাটিতেই বসে পড়লাম।

দিনভর পথ চলার পরিশ্রমে কখন যে চোখ লেগে গেল তা মনে নেই।

জামা প্যান্ট সব চপচপে ভেজা, 

তাই ঠান্ডায় হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই মনে হোল কটা বাজে?

পকেট থেকে হাত ঘড়িটা বেরকরে  দেখলাম রাত্রি 2টা 15 মিনিট।

তখন তো আর মোবাইল ছিলনা।

আর বৃষ্টির জন্য ঘড়িটা খুলে পকেটে রুমাল পেঁচিয়ে রেখেছিলাম।

এখন মনেহয় আর বৃষ্টি পড়ছে না। 

মাথার ওপরের ছাউনি তে আর কোন শব্দ  হচ্ছে না বৃষ্টিপড়ার।

বাইরে আসতেই দেখলাম আকাশে  চতুর্দশীর চাঁদ  রাত ভর জেগে নীল আকাশে ভেসে একলা তার শান্ত স্নিগ্ধ আলো  ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে ।

বৃষ্টি ভেজা গাছের পাতায় চাঁদের আলো পরে সুন্দর এক রোমান্টিক দৃশ্য সৃষ্টি করেছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে বোঝার কোন উপায় নাই যে একটু আগে মুষল ধারে বৃস্টিতে পুরো এলাকা নাস্তা নাবুদ হয়ে গিয়েছিলো। এখনো একটু আধটু সাদা মেঘ উরে বেড়াচ্ছে, মেঘ গুলো দেখে শ্বেতশুভ্র বলাকা গুচ্ছের মত মনে হচ্ছে উরে বেড়াচ্ছে।

চারি পাশের প্রকৃতিও যেন রংপাল্টাছে , মনেহচ্ছে প্রকৃতিতে যেন রূপ পরিবর্তনের পালা চলছে। চাঁদের আলোয় বনানি যেন রুপালি চাদর জড়িয়ে আছে।

মনেহয় বৃক্ষ সকল হেলে দুলে হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকছে,যেন কাছে যেতে বলছে।


হঠাৎ শুনতে পেলাম ঘরের  ভিতর থেকে গোঙানির আওয়াজ । আমি যেখানে বসে ছিলাম সেটি একটি খোলা বারান্দা।

বৃষ্টিতে যে বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে ছিলাম সেই ঘরের ভেতর থেকে কার যেন গোঙানির আওয়াজ আসছে।

গোঙানির আওয়াজ ও একটা কুঁই কুঁই আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম কিন্তু কিছু একটা বলছে, কাকে বলছে বা কী বলছে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না বা কিসের আওয়াজ, ওদিকে যাবার রাস্থা ই বা কোন দিকে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

তখন রাত্রি 3:25 মিনিট জোৎস্না রাত তাই একটু আলো আঁধারীতে দেখতে পেলাম এক বন্ধ দরজা।

অগত্যা দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম,

কিন্তু দরজা ভিতর থেকে বন্ধ।

একটু ঠেলা ঠেলির চেষ্টা করেও কোন লাভ হলনা। অগত্যা দরজাতে বাইরের দিকের শিকল দিয়ে আওয়াজ করলাম।

তাতেও কোন সাড়া শব্দ পেলামনা।

গোঙানিটা বন্ধ হলেও কুঁই কুঁই আওয়াজ তখনো শুনতে পাচ্ছিলাম।

কিছুক্ষন পরে মনে হোল কোন অসুস্থ্য বৃদ্ধ 

কাশছেন, ওনার কাশির আওয়াজ শুনে মনে হোল উনি অসুস্থ।

তখন বাধ্য হয়ে আরও জোড়ে ধাক্কা দিয়ে

দরজা খোলার বৃথা চেষ্টা করলাম।

রাতের অন্ধকারে প্রায় সবরকম চেষ্টা করেও কোন ভাবে ভেতরে ঢুকতে নাপেরে হতাশ মনে দরজা ভাঙতে উদ্দত হলাম হঠাৎ দেখি একজন কৃষক গরু নাঙ্গল নিয়ে পাশের রাস্থা দিয়ে যাচ্ছেন।

আমি দৌড়ে গিয়ে ওই কৃষক কে সব বললাম কৃষক টি আমার কথা প্রথমে বুঝতে পারছিলো না। পড়ে আমি কিছুটা 

হিন্দি ও ছত্তিশগড়ে ভাষা মিশিয়ে বলতে উনি বুঝলেন এবং সব শুনে উনি ওনার ভাষায় বললেন  যে ওই বাড়িতে তো একজন বয়স্ক মানুষ একাই থাকেন। তবে নিশ্চই ওনার কোন বিপদ হয়েছে।

(আমি ছত্তিশগড়ের ভাষা বুঝতে পারি 

তাই ওনার কথা বুঝতে কোন অসুবিধা হচ্ছিলো না।)

যাইহোক দুজনে অনেক কথা বলা বলির পরে কৃষক ভাই তার হাতের কাটারী দিয়ে জানালার দরমা ফাঁক করে সেখান থেকে ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা খুলে দিলেন।

আমরা ভিতরে গিয়ে দেখি একজন বয়স্ক মানুষ উঠোনে পড়ে আছেন , এখন মনেহয় অজ্ঞান হয়ে গেছেন।

দেখে মনেহয় উনি কোনভাবে পা পিছলে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। একটু দূরে শেকলে বাঁধা একটি ছোট কুকুরের বাচ্চা শিকল থেকে মুক্তি পাবার জন্য কুঁই কুঁই করছে।

আসলে কুকুরটি তার মালিকের বিপদ বুঝে অস্থির হয়ে কান্না কাটি করছিল।

 আমারা দুইজনে ভদ্র লোকটির চোখে মুখে জল দিয়ে কোন মতে ওনার জ্ঞান ফিরিয়ে ওনাকে ঘরের খাটিয়াতে শুইয়ে দিলাম।

আসলে ওনার উঠান পুরোপুরি শ্যওলাতে  ভর্তি। সেই কারণে বৃস্টি তে ওনার পা পিছলে গিয়ে  এমন ঘটনা ঘটেছে।


কৃষক ভাই দৌড়ে চলে গেলেন পাশের 

কয়েকটা বাড়ি পরে এই গ্রামের ডাক্তারকে আনতে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে কৃষক ভাই একজন কম্পাউন্ডার কে নিয়ে হাজির হলেন। সাথে আরো দশ বারোজন মানুষও আসলেন।

কমপাউন্ডার ভদ্রলোক সব দেখে বললেন কোন ভয় নেই।

তবে পরে গিয়ে বেশ আঘাত পেয়েছেন।

এখন মনে হয় একটু সুস্থ, তবে ওনার বিশ্রাম দরকার। আর একটু বেলায় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চেকআপ করিয়ে আনলেই হবে। সেই কারণে সকলে মিলে ওনার মেয়েকে সংবাদ পাঠিয়ে ডেকে 

আনার তোড়জোড় শুরু করলেন।

জানলাম ওনার মেয়ে চিরিমিরী 

কোলিয়ারীতে থাকেন। 

এরপরে একটু বেলা হতেই সকলে মিলে ওনাকে বিলাশপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করলো।

তখন আমিও সকলকে বিদায় জানিয়ে রওনা দেবার উদ্দ্যোগ করলাম।

কিন্তু এবার সকলে আমার ও ওই কৃষক ভাই যার নাম মহেশ রাম আমাদের কাছে গত রাত্রের সকল ঘটনা শুনে আমাকে কেউ আর যেতে দিলোনা।

তখন বাধ্য হয়ে একজনের বাড়িতে দুপুরে স্নান খাওয়া দাওয়া করে রওনা দিলাম আমার সেই কাঙ্খিত মন্দিরটি দেখবার  জন্য। এবার অবশ্য ওই গ্রামের মানুষরাই সাইকেলে আমাকে নিয়ে গিয়ে মন্দিরটি দেখিয়ে আনলেন  এবং পরের দিন আবার দিনের বেলা স্নান খাওয়া দাওয়ার পরে আমাজে সাইকেলে বর রাস্থায় বাসস্টান্ডে পৌঁছে দিলেন।

আমিও ফিরে গেলাম আমার 

বাঁকিমগড়ার ক্যাম্পে গেভরা রোডের কাছে , এখান থেকে কুশমুণ্ডা কোলিয়ারী খুব কাছে।

      <----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-----> -

                   25/08/2024

===========================

Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

626>||--দাদু ভাই--||