605>||-শিখিয়ে - শিখলাম-||
605>||-শিখিয়ে - শিখলাম-||
<--©----আদ্যনাথ--->
কালের প্রভাবে সময় এগিয়ে চলে।
প্রকৃতির নিয়মে সকল কার্য চলতে থাকে।
আমরা সমান্য কিছু করে প্রশংসা কুড়াই।
এই প্রশংসা বড়ই বিদঘুটে ব্যাপার।
প্রশংসা কখনো উৎসাহ যোগায়
আরো ভালো কাজ কারবার।
কখনো দম্ভের জন্ম দেয় মনে,
আর এই দম্ভ মানুষকে ঠেলে দেয়
অধঃপতনের গভীর তলে।
সে যেমন হোক আজ যা বলতে চাই
সেও এক জীবনের ঘটনা আর সেই
ঘটনার চিন্তা করলে আজো মনেহয়
মানুষ কি না পারে করতে।
এই কিছু করার জন্য চাই প্রবল
উৎসাহ,উদ্দীপনা মনের একান্ত
ভাবনা, কিছু আলাদা করার প্রেরণা।
গল্প টা শুরু ব্ল্যাকডায়মন্ড ট্রেন টি
রানীগঞ্জ স্টেশনে যখন ঢুকছিল।
আমি তখন ধানবাদে পোস্টিং।
দিন টা ছিল 27 ফেব্রুয়ারি 1993,.
তারিক টা মনে থাকার বিশেষ কারন
ছিল।
কারন 28 ফেব্রুয়ারি আমার
জীবনে একটি বিশেষ দিন।
এবং সেই কারণেই তারিখ তা মনে আছে।
বৎসর টা ঠিক মনে নাই,
তবে যতদূর মনে পরে 1993 সালই হবে।
আমি প্রত্যেক শনিবার বিকেলে
ব্ল্যাকডায়মন্ড ধরে বাড়ি ফিরি।
আবার সোমবার সকালে ঐ ট্রেনেই
যাই ধানবাদে।
সেদিন আমরা পাঁচ ছয় জন ছিলাম
সামনা সামনি সিটে বসে।
ট্রেন টি রানীগঞ্জ স্টেশনে ঢুকবে
তখন একটি সুন্দর চেহারার ভদ্র
এই 12 কি 14 বছরের ছেলে এসে
ভিক্ষা চাইলো।
" দাদারা সকাল থেকে কিছু খাইনি
খিদে পেয়েছে। কিছু দেবেন ?"
আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন তুই তো
ভিক্ষা করার মতন মনে হয় না ,
কেন ভিক্ষা কর ছিস,এভাবে ভিক্ষা
না করে কাজ করতে পারিস তো।
কাজ করবি?
ছেলেটি কেঁদে ফেললো বললো
" দদা আমি ভিক্ষা করতে চাইনা,
অনেক চেষ্টা করেও কেউ কোন কাজে
নেয় না।কেউ কোন কাজ দেয় না।
অনেক হোটেলেও কাজ করবার জন্য
চেষ্টা করেছি কিন্তু কেউ ই কাজে
নেয় না সবাই বলে আমি পারবোনা।
দাদা আপনি আমাকে যে কোন কাজ
দেবেন আমি ঠিক পারবো।"
আমি ভাবলাম ওজখন বলছে তো
ওকে নিয়ে গিয়ে কোন গ্যারেজে
লাগিয়ে দি, কাজ শিখুক। তারপরে
ওর বয়স হলে ট্যাক্সি চালিয়েও
করে খেতে পারবে।
এমন চিন্তা করে ওকে বললাম ঠিক
আছে এই নে 10 টাকা দিলাম,
এদিয়ে কিছু খেয়ে নে,
আর কালকে তুই আমার সাথে দেখা কর।
ডানলোপ চিনিস?
ও বললো না ডানলোপ চিনিনা,
আমি বললাম তোর বাড়ি কোথায়।
ও বললো ওর বাড়ি কুমারধুবি তে।
আমি বললাম ঠিক আছে তুই কবে
আসতে পারবি বল।
ও বললো সোমবার পারবো।
আমি বললাম না সোমবার আমি
ধানবাদে চলে আসব। তুই তাহলে
আগামী শনিবার আমার সাথে
দেখা করে এই ট্রেনে।
ও ঠিক আছে বলে নমস্কার করে
চলে গেল।
আমি ভেবে নিয়েছিলাম ও আর
আসবে না।
কত ছেলেইতো বলে কাজ চাই
কিন্তু কেউই পরে আর দেখা করে না।
ও ঠিক তেমনি আর দেখা করবে না।
এটা নিয়ে আর কোন চিন্তা করি নি।
কিন্তু পরের শনিবার ওই ছেলেটি ঠিক
এসে হাজির। সকলে একটু টিটকারি
করেই বললো।
রায়চৌধুরী তোমার ছেলে হাজির,
এবার কোথায় ওকে চাকুরী করে দেবে দেখো।
আমাদের সাথে এক ডাক্তার ছিল, তিনিও
ব্যাঙ করলেন খানিকটা।
আমি কারুর কোন কথায় আমল না দিয়ে
ছেলে টিকে বললাম তুমি আগামী কাল
আমার সাথে দেখা করো ডানলপে।
আমি ঠিকানা ও নির্দেশ ভালো করে
লিখে দিলামএবং বুঝিয়ে দিলাম কি
করে যেতে হবে।
আমি ওকে 75 টাকা দিলাম গাড়ি
ভাড়াও ওর খাবার জন্য। তখন ওই
75 টাকাই আমার পকেটে ছিল।
তার পরের দিন ও ঠিক ডানলপে এসে
আমার নির্দেশ মতন দেখা করলো।
আমি ওকে নিয়ে বনহুগলির অমর
গ্যারেজের দিকে রওনা দিলাম।
ওই গ্যারেজে মালিক আমার জানাশোনা।
কিন্তু হঠাৎ কেন জানিনা আমার মনে হল
এই গ্যারেজের এত খাটুনির কাজ ও
করতে পারবে না।
তাই ওকে বললাম না তোকে অন্য কাজ
দেব তুই ব্যবসা কর।
এই বলে ওকে নিয়ে গেলাম হাওড়া
ফুলের হাটে। 20 টাকার ফুল কিনে
ওকে সাথে নিয়ে জম্বু তাওয়াই ট্রেনে করে
করে ধানবাদ পৌঁছলাম এবং আমার চেনা
জানা ফুলের দোকানে ওকে পরিচয়
করিয়ে দিয়ে বললাম এই ছেলেটি রোজ
আপনাকে ফুল এনে দেবে।
দোকানদার সব শুনে বললো ঠিক
আছে ও জতো পারে ফুল আনুক সব
আমি নিয়ে নেব।
সেদিনের ওই 20 টাকার ফুল বেঁচে পেল
80 টাকা।
আমি বললাম দেখ 20 টাকার ফুল
80 টাকায় বিক্রি হল।
তুই কাল কে আবার 50--60 টাকার
ফুল কিনে এদের দিয়ে জাস।
দেখ কিছু করতে পারিস কি না।
এমনি করে ওকে গোম স্টেশন, এবং চাষ,
বোকারো সকল দোকান দারদের সাথে
পরিচয় করিয়ে দিলাম যতটুকু আমার
জানা চেনা আছে।
তার পর কালের কাজ কালই করে।
আমিও আর কোন খবর রাখলাম না।
সকল ভুলে গেলাম।
এর পরে প্রায় তের বৎসর পরে যতদূর
মনে পরে 2006 সালে বা 2007 সালে
আমার চাকুরী থেকে অবসর নেবার
তিন বা চার বৎসর আগে।
এই একই ভাবে আমরা ফিরছি
ব্লাকডায়মন্ড এক্সপ্রেসে।আমরা
সিঙ্গারা চপ খাচ্ছিলাম হঠাৎ কুমারধুবি
স্টেশনে সাফারিশুট পরে খুব সুন্দর
দেখতে একটি এই 27 কি 28 বৎসরের
ছেলে এসে বিবাহের নিমন্ত্রণ কার্ড আমায়
দিয়ে বললো, দদা আমি তো আপনাদের
নাম জানিনা, আপনারা যেকজন আছেন ,
একটু নাম গুলি লিখে নেবেন। এবং
আমার বিয়েতে আপনাদে আসতেই হবে।
আমি বললাম কেন ভাই তুমিকে তাই
জনলাম না চিনলাম না তা তোমার
বিয়েতে আমাদের নিমন্ত্রণ করছো কেন?
তুমি কিভাবে চিনলে আমাদের?
ছেলেটি অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে
তাকিয়ে বললো দাদা আমাকে আপনি
চিনতে পারছেন না?
না ভাই তোমাকে ঠিক চিনতে পারলামনা।
ছেলেটি বললো আমি
( নামটি উহ্য রাখলাম)।
আপনার মনে আছে একটি ছেলেকে
হাওড়া ফুলের হাট থেকে 20 টাকার
ফুল কিনে দিয়ে ব্যবসা করতে
শিখিয়ে ছিলেন,
কিছু দোকান ধরিয়ে দিয়ে ছিলেন।
আমি বললাম হ্যা মনে পড়েছে।
তুমিকি সেই ছেলে? তা এখন তুমি কি
করো?
সে বললো হ্যা আমি সেই(--)আপনি
যেদিন থেকে ফুলের ব্যবসা শিখিয়েছেন
আমি সেদিন থেকে আজ অবধি ওই
ফুলের ব্যবসা এবং সাথে মাছের ব্যবসা
করছি।
প্রত্যেক দিন তিনটি ট্রেনে ব্লকডায়মন্ড,
জম্বু তাওয়াই, বোম্বে মেলে,আমার
ফুল যায় সেই চক্রধর পুর, ইসরী,
গোম ধানবাদ, রানীগঞ্জ, সকল জায়গায়,
আর ওই ইসরী, বিহার থেকে বিভিন্ন মাছ,
মাছের পোনা, কলকাতা, ব্যান্ডেল,
শ্রীরামপুরে নিয়ে আসি।
এখন আপনাদের দয়ায় প্রায় 70 জন
মহিলা ও 50 জন ছেলে কে নিয়ে আমি
কাজ করছি।
আগে তো এই লাইনে আমি একলাই
ছিলাম আজকাল অনেক কম্পিটিশন।
সে যাইহোক কম বেশি একশ কুড়ি
জনের রোজের খাবার জোগাড় তো হয়।
ওতেই আমি খুশি।
দাদা আমি তো ভালো মতই জানি
ক্ষুদার জ্বালা।
সেদিন আমার বাড়িতে মা জ্বরে
পরে ছিল আর আমি সেদিন কোন ভাবেই
পারিনি একটু খাবার জোগাড় করতে
বা মায়ের জন্য ওষুধ জোগাড় করতে।
দাদা মনে আছে প্রথম দিন ফুল বিক্রি করে
আপনি 80 টাকা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন
এইনেও এই টাকা দিয়ে ব্যবসা করো।
কারুর কাছে হাত পাতবে না।
অন্যায় ভাবে ব্যবসা করবে না।
জীবনে চেষ্টা করবে অন্যের জন্য কিছু করতে।
প্রকৃত দুস্থ কে সাহায্য করতে।
আপনি বলেছিলেন কোন সময় প্রয়োজন পড়লে
আপনাকে এই ট্রেনেই শনিবার পাবো।
আমি স্তম্ভিত হয়ে ওর কথা শুনছিলাম।
ও বলে চললো আপনারা সকলে আসলে
আমার মা ভীষণ খুশি হবেন।
আমরা বললাম দেখোওই 12জানুয়ারী
বৃহস্পতি বার মানে উইক ডেতে বিয়ে
তাই একটু চিন্তা করছি দেখি নিশ্চই চেষ্টা করবো।
তারপরে অনেক ভেবে আমরা চার জন
আমি দুইজন ফোর ম্যান এবং ডাক্তার বাবু
গিয়েছিলাম ওর বিয়েতে।
কুমারধুবি গিয়ে একটু খোঁজ করতেই
ওর বাড়ি পেয়ে গেলাম।
বেশ বড় বাড়ি করেছে।
আমাদের দেখে ছেলেটি বেশ আনন্দিত
হয়েছিল।
ছেলেটি ওর মায়ের সাথে আমাদের
একে একে পরিচয় করিয়ে দিল।
ওর মা সত্যি ভিষিন খুশি হয়েছিলেন।
আমাদের আলাদা করে ভদ্র মহিলা
পাশে বসিয়ে যত্ন করে খাওয়ালেন ।
উনি বললেন
ওর বাবার মৃত্যুর পরে ওর কাকা রা
দোকান পাট সব দখল করে নিয়েছে।
খাওয়া তো দূরের কথা ছেলেটার
স্কুলে পড়ার খরচ বই পত্র কেনও কোন
পয়সা দিতে রাজি হয় নি।
ছেলে টিকে নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে
ছিলাম ওই মন্দিরের পাশে ভাঙা ঘটায়
রাতের পর রাত কেটেছে।
শেষে একদিন ও ভিষিন আনন্দ করে
বাড়ি ফিরলো,
এবং আপনার সব কথা বলেছিল।
এই 80 টাকা দিয়ে আমার ওষুধ, একটু
চাল ডাল কিনে এনে ছয় মাস পরে
আমি প্রথম রান্না করলাম ও ভীষণ
তৃপতি করে ভাত খেলাম।
ছেলের প্রথম আয়ের পয়সাতে।
বললেন এই ব্যাবসা করেই ছেলে বাড়ি
বানিয়েছে।
বাড়িতে আমরা দুই জন এখন থেকে
তিনজন হবে।
গত তিন বছর ধরে আমার ছেলের ইচ্ছায়
রোজ কমকরে দশ জনের পাত পরে।
ভদ্র মহিলা আমাকে দেখিয়ে বললেন
আপনার কথা মতো রোজ ওই দশজন
অন্ধ, অপারগ, পঙ্গু মানুষ কে খাওয়ায়।
সত্যি বলছি এতো দিন শুধু নিজেদের
আরাম ও খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতাম।
গত তিন বৎসর ধরে ওই দুস্থ অসহায়
মানুষ গুলিকে একটু খাবার দিতে পেরে
এত আনন্দ পাই যে কি বলবো।
এত আনন্দ জীবনে কোন দিন পাইনি।
ওদের খাবার সময় আমাদের সেই
না খেয়ে উপবাসের দিনগুলির কথা
মনে পড়ে।আর ওদের মুখের হাসি দেখে
ভীষণ আনন্দ পাই। অতীতের সকল
কষ্ট ভুলে যাই।
যাইহোক আমরা খাওয়া দাওয়া করে
তারা তারি চলে আসতে চাইলাম
কারন ট্রেন নাপালে ফিরতে কষ্ট হবে।
ছেলেটি বললেন কেন দাদা এত চিন্তা
কিসের আপনারা আমার ভগবান তাই
আপনারা যে আমার বাড়িতে পা
রেখেছেন তাতেই আমি ও আমার মা
ভীষণ খুশি । ধানবাদ যাবার জন্য কোন
চিন্তা করতে হবে না।
আমি তো ভেবে ছিলাম আপনারা 7 - 8
জন আসবেন তাই দুইখান গাড়ি রেখে
ছিলাম। আপনাদে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব
আমার।
ওর ব্যবস্থা মতন ও আমাদের পৌঁছে দিল।
আমি ফিরে আসলাম আর মনে মনে
একটাই চিন্তা হতে লাগলো।
মানুষ চাইলে কী না করতে পারে।
মানুষের অসম্ভব বলে কিছুই হয় না।
চেষ্টা থাকলে মানুষ সব করতে পারে।
চাই সততা ও মনের একান্ত চাহিদা।
এমন ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়।
অনেকের নানান প্রতিভা থাকে, কিন্তু
আমি মনে করি----
প্রতিভা দিয়েই সব হয় না,
প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি, একাগ্রতা
ও কঠোর পরিশ্রম।
সফলতার জন্য প্রয়োজন
প্রতিভার সাথে ইচ্ছাশক্তি ও
কঠোর পরিশ্রম।
সেদিন আমি ঐ ছেলেটির কাছে শিখলাম
নুতন করে যে সততা ওকর্মে নিষ্ঠা
মানুষকে অনেক কিছুই দিতে পারে।
এবং ঈশ্বর সদাই তার সহায়তা করেন।
বাকি জীবন এই শিক্ষাকে মনে রেখেই চলবো।
আমিও মনে মনে এমন চিন্তা করলাম।
তাইতো বলছিলাম -----
শিখিয়ে ----শিখলাম নুতন করে।
[[ এই লেখাটি কোন গল্প নয়
আমার জীবনে একটি সত্য ঘটনা। ]]
【--anrc-28/09/2018--】
【=রাত্রি:01:08:22am=】
【=তেঘরিয়া=কোলকাতা -59=】
==============================
<--©----আদ্যনাথ--->
কালের প্রভাবে সময় এগিয়ে চলে।
প্রকৃতির নিয়মে সকল কার্য চলতে থাকে।
আমরা সমান্য কিছু করে প্রশংসা কুড়াই।
এই প্রশংসা বড়ই বিদঘুটে ব্যাপার।
প্রশংসা কখনো উৎসাহ যোগায়
আরো ভালো কাজ কারবার।
কখনো দম্ভের জন্ম দেয় মনে,
আর এই দম্ভ মানুষকে ঠেলে দেয়
অধঃপতনের গভীর তলে।
সে যেমন হোক আজ যা বলতে চাই
সেও এক জীবনের ঘটনা আর সেই
ঘটনার চিন্তা করলে আজো মনেহয়
মানুষ কি না পারে করতে।
এই কিছু করার জন্য চাই প্রবল
উৎসাহ,উদ্দীপনা মনের একান্ত
ভাবনা, কিছু আলাদা করার প্রেরণা।
গল্প টা শুরু ব্ল্যাকডায়মন্ড ট্রেন টি
রানীগঞ্জ স্টেশনে যখন ঢুকছিল।
আমি তখন ধানবাদে পোস্টিং।
দিন টা ছিল 27 ফেব্রুয়ারি 1993,.
তারিক টা মনে থাকার বিশেষ কারন
ছিল।
কারন 28 ফেব্রুয়ারি আমার
জীবনে একটি বিশেষ দিন।
এবং সেই কারণেই তারিখ তা মনে আছে।
বৎসর টা ঠিক মনে নাই,
তবে যতদূর মনে পরে 1993 সালই হবে।
আমি প্রত্যেক শনিবার বিকেলে
ব্ল্যাকডায়মন্ড ধরে বাড়ি ফিরি।
আবার সোমবার সকালে ঐ ট্রেনেই
যাই ধানবাদে।
সেদিন আমরা পাঁচ ছয় জন ছিলাম
সামনা সামনি সিটে বসে।
ট্রেন টি রানীগঞ্জ স্টেশনে ঢুকবে
তখন একটি সুন্দর চেহারার ভদ্র
এই 12 কি 14 বছরের ছেলে এসে
ভিক্ষা চাইলো।
" দাদারা সকাল থেকে কিছু খাইনি
খিদে পেয়েছে। কিছু দেবেন ?"
আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন তুই তো
ভিক্ষা করার মতন মনে হয় না ,
কেন ভিক্ষা কর ছিস,এভাবে ভিক্ষা
না করে কাজ করতে পারিস তো।
কাজ করবি?
ছেলেটি কেঁদে ফেললো বললো
" দদা আমি ভিক্ষা করতে চাইনা,
অনেক চেষ্টা করেও কেউ কোন কাজে
নেয় না।কেউ কোন কাজ দেয় না।
অনেক হোটেলেও কাজ করবার জন্য
চেষ্টা করেছি কিন্তু কেউ ই কাজে
নেয় না সবাই বলে আমি পারবোনা।
দাদা আপনি আমাকে যে কোন কাজ
দেবেন আমি ঠিক পারবো।"
আমি ভাবলাম ওজখন বলছে তো
ওকে নিয়ে গিয়ে কোন গ্যারেজে
লাগিয়ে দি, কাজ শিখুক। তারপরে
ওর বয়স হলে ট্যাক্সি চালিয়েও
করে খেতে পারবে।
এমন চিন্তা করে ওকে বললাম ঠিক
আছে এই নে 10 টাকা দিলাম,
এদিয়ে কিছু খেয়ে নে,
আর কালকে তুই আমার সাথে দেখা কর।
ডানলোপ চিনিস?
ও বললো না ডানলোপ চিনিনা,
আমি বললাম তোর বাড়ি কোথায়।
ও বললো ওর বাড়ি কুমারধুবি তে।
আমি বললাম ঠিক আছে তুই কবে
আসতে পারবি বল।
ও বললো সোমবার পারবো।
আমি বললাম না সোমবার আমি
ধানবাদে চলে আসব। তুই তাহলে
আগামী শনিবার আমার সাথে
দেখা করে এই ট্রেনে।
ও ঠিক আছে বলে নমস্কার করে
চলে গেল।
আমি ভেবে নিয়েছিলাম ও আর
আসবে না।
কত ছেলেইতো বলে কাজ চাই
কিন্তু কেউই পরে আর দেখা করে না।
ও ঠিক তেমনি আর দেখা করবে না।
এটা নিয়ে আর কোন চিন্তা করি নি।
কিন্তু পরের শনিবার ওই ছেলেটি ঠিক
এসে হাজির। সকলে একটু টিটকারি
করেই বললো।
রায়চৌধুরী তোমার ছেলে হাজির,
এবার কোথায় ওকে চাকুরী করে দেবে দেখো।
আমাদের সাথে এক ডাক্তার ছিল, তিনিও
ব্যাঙ করলেন খানিকটা।
আমি কারুর কোন কথায় আমল না দিয়ে
ছেলে টিকে বললাম তুমি আগামী কাল
আমার সাথে দেখা করো ডানলপে।
আমি ঠিকানা ও নির্দেশ ভালো করে
লিখে দিলামএবং বুঝিয়ে দিলাম কি
করে যেতে হবে।
আমি ওকে 75 টাকা দিলাম গাড়ি
ভাড়াও ওর খাবার জন্য। তখন ওই
75 টাকাই আমার পকেটে ছিল।
তার পরের দিন ও ঠিক ডানলপে এসে
আমার নির্দেশ মতন দেখা করলো।
আমি ওকে নিয়ে বনহুগলির অমর
গ্যারেজের দিকে রওনা দিলাম।
ওই গ্যারেজে মালিক আমার জানাশোনা।
কিন্তু হঠাৎ কেন জানিনা আমার মনে হল
এই গ্যারেজের এত খাটুনির কাজ ও
করতে পারবে না।
তাই ওকে বললাম না তোকে অন্য কাজ
দেব তুই ব্যবসা কর।
এই বলে ওকে নিয়ে গেলাম হাওড়া
ফুলের হাটে। 20 টাকার ফুল কিনে
ওকে সাথে নিয়ে জম্বু তাওয়াই ট্রেনে করে
করে ধানবাদ পৌঁছলাম এবং আমার চেনা
জানা ফুলের দোকানে ওকে পরিচয়
করিয়ে দিয়ে বললাম এই ছেলেটি রোজ
আপনাকে ফুল এনে দেবে।
দোকানদার সব শুনে বললো ঠিক
আছে ও জতো পারে ফুল আনুক সব
আমি নিয়ে নেব।
সেদিনের ওই 20 টাকার ফুল বেঁচে পেল
80 টাকা।
আমি বললাম দেখ 20 টাকার ফুল
80 টাকায় বিক্রি হল।
তুই কাল কে আবার 50--60 টাকার
ফুল কিনে এদের দিয়ে জাস।
দেখ কিছু করতে পারিস কি না।
এমনি করে ওকে গোম স্টেশন, এবং চাষ,
বোকারো সকল দোকান দারদের সাথে
পরিচয় করিয়ে দিলাম যতটুকু আমার
জানা চেনা আছে।
তার পর কালের কাজ কালই করে।
আমিও আর কোন খবর রাখলাম না।
সকল ভুলে গেলাম।
এর পরে প্রায় তের বৎসর পরে যতদূর
মনে পরে 2006 সালে বা 2007 সালে
আমার চাকুরী থেকে অবসর নেবার
তিন বা চার বৎসর আগে।
এই একই ভাবে আমরা ফিরছি
ব্লাকডায়মন্ড এক্সপ্রেসে।আমরা
সিঙ্গারা চপ খাচ্ছিলাম হঠাৎ কুমারধুবি
স্টেশনে সাফারিশুট পরে খুব সুন্দর
দেখতে একটি এই 27 কি 28 বৎসরের
ছেলে এসে বিবাহের নিমন্ত্রণ কার্ড আমায়
দিয়ে বললো, দদা আমি তো আপনাদের
নাম জানিনা, আপনারা যেকজন আছেন ,
একটু নাম গুলি লিখে নেবেন। এবং
আমার বিয়েতে আপনাদে আসতেই হবে।
আমি বললাম কেন ভাই তুমিকে তাই
জনলাম না চিনলাম না তা তোমার
বিয়েতে আমাদের নিমন্ত্রণ করছো কেন?
তুমি কিভাবে চিনলে আমাদের?
ছেলেটি অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে
তাকিয়ে বললো দাদা আমাকে আপনি
চিনতে পারছেন না?
না ভাই তোমাকে ঠিক চিনতে পারলামনা।
ছেলেটি বললো আমি
( নামটি উহ্য রাখলাম)।
আপনার মনে আছে একটি ছেলেকে
হাওড়া ফুলের হাট থেকে 20 টাকার
ফুল কিনে দিয়ে ব্যবসা করতে
শিখিয়ে ছিলেন,
কিছু দোকান ধরিয়ে দিয়ে ছিলেন।
আমি বললাম হ্যা মনে পড়েছে।
তুমিকি সেই ছেলে? তা এখন তুমি কি
করো?
সে বললো হ্যা আমি সেই(--)আপনি
যেদিন থেকে ফুলের ব্যবসা শিখিয়েছেন
আমি সেদিন থেকে আজ অবধি ওই
ফুলের ব্যবসা এবং সাথে মাছের ব্যবসা
করছি।
প্রত্যেক দিন তিনটি ট্রেনে ব্লকডায়মন্ড,
জম্বু তাওয়াই, বোম্বে মেলে,আমার
ফুল যায় সেই চক্রধর পুর, ইসরী,
গোম ধানবাদ, রানীগঞ্জ, সকল জায়গায়,
আর ওই ইসরী, বিহার থেকে বিভিন্ন মাছ,
মাছের পোনা, কলকাতা, ব্যান্ডেল,
শ্রীরামপুরে নিয়ে আসি।
এখন আপনাদের দয়ায় প্রায় 70 জন
মহিলা ও 50 জন ছেলে কে নিয়ে আমি
কাজ করছি।
আগে তো এই লাইনে আমি একলাই
ছিলাম আজকাল অনেক কম্পিটিশন।
সে যাইহোক কম বেশি একশ কুড়ি
জনের রোজের খাবার জোগাড় তো হয়।
ওতেই আমি খুশি।
দাদা আমি তো ভালো মতই জানি
ক্ষুদার জ্বালা।
সেদিন আমার বাড়িতে মা জ্বরে
পরে ছিল আর আমি সেদিন কোন ভাবেই
পারিনি একটু খাবার জোগাড় করতে
বা মায়ের জন্য ওষুধ জোগাড় করতে।
দাদা মনে আছে প্রথম দিন ফুল বিক্রি করে
আপনি 80 টাকা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন
এইনেও এই টাকা দিয়ে ব্যবসা করো।
কারুর কাছে হাত পাতবে না।
অন্যায় ভাবে ব্যবসা করবে না।
জীবনে চেষ্টা করবে অন্যের জন্য কিছু করতে।
প্রকৃত দুস্থ কে সাহায্য করতে।
আপনি বলেছিলেন কোন সময় প্রয়োজন পড়লে
আপনাকে এই ট্রেনেই শনিবার পাবো।
আমি স্তম্ভিত হয়ে ওর কথা শুনছিলাম।
ও বলে চললো আপনারা সকলে আসলে
আমার মা ভীষণ খুশি হবেন।
আমরা বললাম দেখোওই 12জানুয়ারী
বৃহস্পতি বার মানে উইক ডেতে বিয়ে
তাই একটু চিন্তা করছি দেখি নিশ্চই চেষ্টা করবো।
তারপরে অনেক ভেবে আমরা চার জন
আমি দুইজন ফোর ম্যান এবং ডাক্তার বাবু
গিয়েছিলাম ওর বিয়েতে।
কুমারধুবি গিয়ে একটু খোঁজ করতেই
ওর বাড়ি পেয়ে গেলাম।
বেশ বড় বাড়ি করেছে।
আমাদের দেখে ছেলেটি বেশ আনন্দিত
হয়েছিল।
ছেলেটি ওর মায়ের সাথে আমাদের
একে একে পরিচয় করিয়ে দিল।
ওর মা সত্যি ভিষিন খুশি হয়েছিলেন।
আমাদের আলাদা করে ভদ্র মহিলা
পাশে বসিয়ে যত্ন করে খাওয়ালেন ।
উনি বললেন
ওর বাবার মৃত্যুর পরে ওর কাকা রা
দোকান পাট সব দখল করে নিয়েছে।
খাওয়া তো দূরের কথা ছেলেটার
স্কুলে পড়ার খরচ বই পত্র কেনও কোন
পয়সা দিতে রাজি হয় নি।
ছেলে টিকে নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে
ছিলাম ওই মন্দিরের পাশে ভাঙা ঘটায়
রাতের পর রাত কেটেছে।
শেষে একদিন ও ভিষিন আনন্দ করে
বাড়ি ফিরলো,
এবং আপনার সব কথা বলেছিল।
এই 80 টাকা দিয়ে আমার ওষুধ, একটু
চাল ডাল কিনে এনে ছয় মাস পরে
আমি প্রথম রান্না করলাম ও ভীষণ
তৃপতি করে ভাত খেলাম।
ছেলের প্রথম আয়ের পয়সাতে।
বললেন এই ব্যাবসা করেই ছেলে বাড়ি
বানিয়েছে।
বাড়িতে আমরা দুই জন এখন থেকে
তিনজন হবে।
গত তিন বছর ধরে আমার ছেলের ইচ্ছায়
রোজ কমকরে দশ জনের পাত পরে।
ভদ্র মহিলা আমাকে দেখিয়ে বললেন
আপনার কথা মতো রোজ ওই দশজন
অন্ধ, অপারগ, পঙ্গু মানুষ কে খাওয়ায়।
সত্যি বলছি এতো দিন শুধু নিজেদের
আরাম ও খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতাম।
গত তিন বৎসর ধরে ওই দুস্থ অসহায়
মানুষ গুলিকে একটু খাবার দিতে পেরে
এত আনন্দ পাই যে কি বলবো।
এত আনন্দ জীবনে কোন দিন পাইনি।
ওদের খাবার সময় আমাদের সেই
না খেয়ে উপবাসের দিনগুলির কথা
মনে পড়ে।আর ওদের মুখের হাসি দেখে
ভীষণ আনন্দ পাই। অতীতের সকল
কষ্ট ভুলে যাই।
যাইহোক আমরা খাওয়া দাওয়া করে
তারা তারি চলে আসতে চাইলাম
কারন ট্রেন নাপালে ফিরতে কষ্ট হবে।
ছেলেটি বললেন কেন দাদা এত চিন্তা
কিসের আপনারা আমার ভগবান তাই
আপনারা যে আমার বাড়িতে পা
রেখেছেন তাতেই আমি ও আমার মা
ভীষণ খুশি । ধানবাদ যাবার জন্য কোন
চিন্তা করতে হবে না।
আমি তো ভেবে ছিলাম আপনারা 7 - 8
জন আসবেন তাই দুইখান গাড়ি রেখে
ছিলাম। আপনাদে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব
আমার।
ওর ব্যবস্থা মতন ও আমাদের পৌঁছে দিল।
আমি ফিরে আসলাম আর মনে মনে
একটাই চিন্তা হতে লাগলো।
মানুষ চাইলে কী না করতে পারে।
মানুষের অসম্ভব বলে কিছুই হয় না।
চেষ্টা থাকলে মানুষ সব করতে পারে।
চাই সততা ও মনের একান্ত চাহিদা।
এমন ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়।
অনেকের নানান প্রতিভা থাকে, কিন্তু
আমি মনে করি----
প্রতিভা দিয়েই সব হয় না,
প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি, একাগ্রতা
ও কঠোর পরিশ্রম।
সফলতার জন্য প্রয়োজন
প্রতিভার সাথে ইচ্ছাশক্তি ও
কঠোর পরিশ্রম।
সেদিন আমি ঐ ছেলেটির কাছে শিখলাম
নুতন করে যে সততা ওকর্মে নিষ্ঠা
মানুষকে অনেক কিছুই দিতে পারে।
এবং ঈশ্বর সদাই তার সহায়তা করেন।
বাকি জীবন এই শিক্ষাকে মনে রেখেই চলবো।
আমিও মনে মনে এমন চিন্তা করলাম।
তাইতো বলছিলাম -----
শিখিয়ে ----শিখলাম নুতন করে।
[[ এই লেখাটি কোন গল্প নয়
আমার জীবনে একটি সত্য ঘটনা। ]]
【--anrc-28/09/2018--】
【=রাত্রি:01:08:22am=】
【=তেঘরিয়া=কোলকাতা -59=】
==============================
Comments
Post a Comment