606>||-মানুষ মানুষের জন্য-||

606>||-মানুষ মানুষের জন্য-||
                       <---©----আদ্যনাথ--->

সেদিন যাচ্ছিলাম তেঘরিয়া,
ডানলপ থেকে DN2 বাসটা একটু ভিড় কম দেখে উঠে পড়লাম।  হলদিরাম স্টপেজে নামলাম, তারপর হেটেই তেঘরিয়ার দিগে রওনা দিলাম। মনে হোল একটু খিদে পেয়েছে। ভাবলাম এখন এগারটা বাজে,
সকাল থেকে কিছুই খাই নি। প্রেসারের ওষুধ টা খেতে হবে।তাই একটু কিছু খেতে হবে।
ব্রিজের নীচে অনেক খাবারের দোকান।
একটা দোকান থেকে ডিম পাউরুটি খাচ্ছিলাম। হঠাৎ নজরে পড়লো ,
রাস্তার ধারে এক মহিলা একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ভিক্ষা করছে এবং ঠিক তার পাশেই বসে একটি বাচ্চা মেয়ে একটি বই নিয়ে খাতায় কি জেন লিখছে।একটু কৌতূহল হল। জানতে ইচ্ছা হল বাচ্চাটি কি লিখছে এক মনে। আমার টিফিন খাওয়া শেষ করে ওষুধ টা খেয়ে , একটু লিকার চা খেয়ে (যদিও এখানে লিকার চা কেউই বানাতে চায় না অনেক বলে কয়ে কোন মতে একটু লাল চা বানা করিয়ে খেয়ে নিলাম)।কারন আমি দুধ চা খেতে পারি না।দুধ চা খেলেই আমার গ্যাস  হয়।তাই কষ্ট অনেক কষ্টে একটু লাল চা জোগাড় করে খেয়ে নিলাম।
এবারে আমার কৌতূহল মেটাতে ওই ভিখারিনির কাছে গিয়ে দেখতে ইছ্যা করলো যে ওই বাচ্চা মেয়ে টি কি লিখছে।
কাছে গিয়ে দেখলাম বাচ্চাটি অঙ্ক করছে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম বেশ ভালো ভাবেই অঙ্ক গুলি করছে।ক্লাস থ্রির বই। বাচ্ছা টির কোন দিগে হুশ নাই ও নিজের অঙ্ক নিয়েই ব্যস্ত। মহিলাটি আময় দেখলো।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ওকি কোন স্কুলে পরে? মহিলাটি বললো ওত স্কুলেই পড়তো এখন আর পরে না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন এখন কেন পরে না। মহিলা টি যা বললো সেটা শুনে আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম।
মহিলা টি বললো ওরা থাকতো সোনার পুরের কোন একটা গ্রামে , গ্রামের নামটা বলেছিল,
সেটা আমি ভুলে গেছি।
সে যাই হোক তার কথার অর্থ হল।
ওরা কোন অজ পারা গ্রামে থাকতো,
ওর স্বামী ভেনরিক্সা চলায়। রোজ রাতে নেশা করে এসে ওদের মারধর করতো।
মেয়েটি পড়াশুনায় খুব ভালো ক্লাস ওয়ান থেকে প্রত্যেক বার ভালো ভাবে পাশ করে এখন ক্লাস থ্রিতে পড়তো।
এই গত তিন মাস হল ওর স্বামী আর একটা বিয়ে করে ওদের ঘরথেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
কারন ওর দুটোই মেয়ে। ছেলে জন্ম দিতে পারেনি তাই ওদের তাড়িয়ে বিয়ে নুতন বউ কে নিয়ে ঘর করছে।
আর ওই বাচ্চাটি স্কুলে পড়তো,
একবেলা খাবার তো পেতো। তা ওরা বিতাড়িত হয়ে কিআর করবে ।গত তিন মাস হল ওরা এই ব্রিজের নীচে ই রাত কাটায়।
রোজ কতো রকমের উৎপাত সইতে হয় ওদের।তা মেয়েটির স্কুল যাওয়া তো বন্দ হয়েছে। তবুও ও রোজ নিজের পড়া টুকু করে নেয়। মহিলা টি রোজের খাবার মতন ভিক্ষা করে কোন মতে খাবার বানিয়ে দিন পার করছে।
আমি বললাম তোমরা তোমাদের গ্রামের থানায় গিয়ে এসকল জানাওনি কেন?
উনি বললেন থানায় জানিয়ে ছিল ওই গ্রামের এক জনের সাহায্যে। কিন্তু কিছুই হয়নি ।
ওদের বাড়িতে ঢুকতেই দেয়না। ওরা বাধ্য হয়ে এখানে চলে আসে।
সবটা শুনে ভীষণ মনঃকষ্ট পেলাম।
সে দিন ওর হাতে একটাকুড়ি টাকার নোট দিয়ে চলে এলাম।
হঠাৎ মনে পড়লো ক্যানিং এর চামপাহাটি তে তো আমার মাসির বাড়ি।
ওখানে একটি চার্চ আছে।ওই চার্চের পাদ্রীর সাথে অনেক দিন আগে একবার আলাপ হয়ে ছিল। এই কথা ভেবে চলে গেলাম সেই পাদ্রী মহোদয়ের কাছে ।উনি সবটা শুনলেন।
এবং আমাকে নিয়ে কাছেই এক ভদ্র লোকের বাড়িতে গেলেন। ওখানে ওই ভদ্র লোকটি সব শুনে জানতে চাইলেন ওনার কি করতে হবে।
আমি বললাম যদি দয়া করে ওই বাচ্ছা মেয়েটি কে আপনি আপনার আশ্রয় দেন ও পড়াশুনা করার ব্যবস্থা করেন তবে খুব ভালো হয়।
ভদ্র লোকটি বললেন দেখুন আমার বাড়ির এমন ছয়জন বাচ্ছা থেকে পড়াশুনা করে।
এবার জখোন আপনারা অনুরোধ করেছেন তখন নয় আমার আরও একটি বাচ্ছা বাড়বে।
তাতে আমার কোন অসুবিধা হবেনা।ঈশ্বের কৃপায় এবং এই ডেভিড সাহেবের আনুগত্যে
ওদের ডাল ভাত খাওয়াতে পারবো এবং একটু জায়গাও দিতে পারবো।
কিন্তু কথা হল ওই মহিলা টির কি হবে?
আমি বললাম সেত আমি চিন্তা ই করিনি।
ভদ্র লোকটি আময় বললেন ঠিক আছে আমি কালকে ওখানে যাবো, আপনিও একটু আসবেন। দেখি ওই মহিলাটি যদি রাজি হয় তো আমার একজন কাজের মেয়ে প্রয়োজন।
কারন এতো গুলি বাচ্ছার দেখা শুনানি রান্না বান্না করা একা আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে।
আমার স্ত্রীর শরীর টা ও ভালো নাই।
ও নিজে ব্রেস্ট ক্যানসারের রুগী তবুও, ও জতো টুকু পারে করে, আমার নিজের কোন সন্তান নাই।এই বাচ্চা গুলি ই আমার সন্তান।
আমি অতি আনন্দে এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম এবং তার পরের দিন ঠিক সাড়ে এগারোটায় ভদ্র লোক টি এজটি মারুতি ভেন নিয়ে এসে  দাঁড়িয়ে ছিল আমি ওনার কাছে যেতেই উনি আনন্দিত হয়ে হাত মেলালেন।
আমরা ওই মহিলাটিকে সব বলাতে মহিলাটি হঠাৎ কেঁদে ফেললেন। এবং বার বার আমাদে প্রনাম করতে চাইলেন।
সে যাই হোক আমরা সকলে মিলে কাছের থানায় গেলাম।থামার ও সি খুব ভালো ব্যবহার করলেন আমাদের সকলের পরিচয় এর কপি রেখে উনি কিছু আইনি ব্যবস্থা পুরো করে নিলেন । ও সি ভদ্র লোক বার বার ওই মহিলাকে বললেন। দেখো তুমি কোনটা চাও ।
নিজের বাড়ি যাবে, নাকি এনদের সাথে যাবে।
তুমি যদি তোমার বাড়ি যেতে চাও তো আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।তোমার স্বামী বাধ্য তোমাকে রাখতে। ভবিষ্যতে তোমার স্বামী যাতে তোমাকে মার ধর করতে না পারে আমি সে ব্যবস্থাও করে দিতে পারি। বলো তুমি কি চাও।
মহিলাটি যা বললো সেটা শুনে আমরা সকলে স্তম্ভিত।
মহিলা বললেন দরগা বাবু জোর করে সংসার হয়না। ওখানে থাকলে হয়তো আমাদে পেতে ভাত পড়বে।এবং রোজ ওই মদ মাতালের মার খাওয়া।
তার চাইতে আমার এখানেই ভালো,
কাজ কর্ম করবো, মেয়েটিও পড়াশুনা করতে পারবে।আমিও সেবা করবার সুযোগ পাবো।
তারপরে আমরা ওই চম্পাহাটির কাছে ওই ভদ্র লোকের বাড়িতে গিয়ে।ওদের রেখে আমি ফিরে আসলাম। দুই মাস পরে গত রবিবার আমি কৌতূহল মেটাতে ওই চম্পাহাটি গেলাম।দেখলাম কি সুন্দর পরিবেশ।
ভদ্র লোকটির স্ত্রী অসুস্থ হয়েও কতো কাজ করেন। ওই বাচ্ছা মেয়েটি ভীষণ খুশি কারন ও আবার স্কুলে ভর্তি হয়েছে।
ওই মহিলাটি ও খুশি, খুব আনন্দে সব কাজ করছে।
ওই ভদ্র মহিলাকে বললাম । আপনি অসুস্থ জেনেও আমি আবার তিজনে ভার আপনাদের ওপরে চাপিয়ে দিয়েছি।
যদিও এমন অন্যায় অমানুষিক ব্যবহারের মাফ হয়না তথাপি পারলে আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনাদের দয়ায় একটি মা ও দুটি শিশু বেঁচে থাকবে ।
ভদ্র মহিলা আমার কথার উত্তর বললেন।
আপনি যে উপকার করেছেন তা কোনদিন আপনাকে ভুলবো না।
কারন আপনি কি জানেন দুই মাসেই এই বাচ্ছা মেয়েটি ওর স্কুলের সকল শিক্ষকের মন কেড়ে নিয়েছে।ও পড়া শুনায় ভিষিন ভিষিন ভালো।আর ওর মা ওই ভিখারী মহিলা নিজে ওদের পড়ায়। আপনি কি জানেন ওই মহিলা ক্লাস টেন অর্য্ন্ত পড়াশুনা করেছে।
ও বাড়ির সব কাজ করে আমার সেবা করে।
রান্না বান্না যাবতীয় কাজ ও করে হাসি মুখে।
সকাল থেকে রাত অর্য্ন্ত পরিশ্রম করে,
সমস্ত দিন হাসি টুক লেগে থাকে ওর মুখে।
কি বলবো ওকে পেয়ে আমি ধন্য।
ঈশ্বররই ওকে পাঠিয়েছেন।
ওই তিন জন আমাদের সকলের ভীষণ আপন।
দেখছেন না এই সেই কোলের ছোট্ট বাচ্চাটি।
মাত্র দুই মাসে কতো সুন্দর হয়ে উঠেছে।
আমার কত্তা যতক্ষন বাড়িতে থাকে এই বাচ্চাটি ওর কাছেই থাকে।
ওরা কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না।
এই হল সেদিনের ঘটনা ::---আমার মনে হল একেই বলে মানুষ মানুষের জন্য।

(([[ তবে ঘটনাটি সত্য কিন্তু স্থান কাল নাম সকলি কাল্পনিক।
কারন যার বাড়িতে ওরা আছে সেই ভদ্র লোকের একটাই শর্ত ছিল।
কোনদিন কোন প্রকারে যেন এই বিষয়ে প্রচার
না করি। সেই কারণে বিশেষ করে জায়গার নাম পরিবর্তন করেছি , আমি জানি যে জায়গার নাম আমি লিখলাম এমন জায়গা আছে,
তথাপি ইচ্ছা কৃত জায়গার নাম পরিবর্তন করলাম।  ))]]

     【--anrc-27/09/2018--】
     【=সকাল:05:18:22=】 【=তেঘরিয়া=কোলকাতা -59=】
==========================


Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

626>||--দাদু ভাই--||

627>এক বর্ষার রাত::-