607> ||- অনপেক্ষ -|| ( ছোট গল্প )
607>||- অনপেক্ষ -|| ( ছোট গল্প )
<---©-আদ্যনাথ--->
মেয়েটিকে দেখতাম প্রতি বৎসর স্কুল বা ক্লাবের স্পোর্টসে সকল বিষয়ে প্রথম হতো।
খুব স্মার্ট মেয়েটি।খুব সুন্দর স্বভাব।
লেখা পরাতেও বেশ ভালো।
খোজ নিয়ে জেনে ছিলাম, মেয়েটির
নাম অনন্যা ওই আমাদের ঐ চার নম্বর
গলির তিন নম্বর বাড়িতে থাকেন মদন বাবু।
মদন কুমার তাঁতী। আমাদের খুব পরিচিত।
তারই বরো মেয়ে অনন্যা।
মদন বাবুর কেরানীর চাকুরী।
মদন বাবু একটু বেশি বয়সে করেছিলেন বিয়ে ।
গিন্নীর নাম ছিল গৌরী দেবী।
ষোড়শী, রূপসী তন্বী।
মদন বাবু স্বপ্নে ও ভাবেন নি,
তিনি পাবেন এমন সুন্দর গিন্নী।
ভালোয় ভালোয় পার হলো মধু যামিনী,
এবার মদন বাবুর হলো খেয়াল,
বংশ রক্ষা করার জন্য চাই সন্তান।
তাই অনেক আদরে গিন্নী কে বলেন,
ওগো গিন্নী দিয়ো একটা ছেলে সন্তান।
বংশ রক্ষা করা ভীষণ দরকার,
তাই করলাম বিয়ে তোমাকে।
গিন্নী কি আর বলবে।
দেখ ঠাকুরের কি ইচ্ছা।
গৌরী বলেন এ তোমার কেমন খেয়াল বলো।
বংশ রক্ষাই উদ্দ্যেশ্য কেবল।
আমিকি সন্তান ধারণের কলই কেবল।
হ্যাঁ গো হ্যাঁ বংশ রক্ষা না হলে আমার
বন্ধ হবে যে রাস্থা স্বর্গে যাবার।
তাইতো বলি ওগো গিন্নী,
যে করেই হোক বংশ রক্ষা অতি জরুরী।
ওগো আমার আদরের গিন্নী রেখো মান,
যে করেই হোক দিও একটি ছেলে সন্তান।
গৌরী কি আর বলবে,
পাড়া গ্রামের আনপড় গরীব ঘরের মেয়ে।
এতো কিয়ার বোঝে,
চুপ করে থাকে,
যা আছে ভাগ্যে তাই হবে।
ছলে মেয়ে হওয়া সেতো
ভগবনের ইচ্ছাতেই হবে।
গৌরীর একটু সাজবার সখ,
মদন বাবু বলেন সাজো মিটিয়ে সখ।
সাজলে তোমাকে খুব সুন্দর লাগে,
আরো সুন্দর হবে যদি কোলে একটি
ছলে থাকে।
সংসার চলে কোনমতে ডালে ভাতে।
মদন বাবুর আবার একটু নেশার সখ আছে,
অফিস ফেরত বাড়ি ফেরেন চার পেগে
গলা ভিজিয়ে খুশির মেজাজে ।
তবুও বহুদিনের ইচ্ছা মনেতে
একটু হুইস্কি তে গলা ভেজাতে।
মাস মাহিনা শেষ হয়ে যায় গৌরীর
সখ মেটাতে ও সংসার চালাতে।
কেরানি হলে কি হবে সংসারে অভাব
রাখেনি কিছুই।
গুনে গুনে নয় মাস পরে,
গৌরী প্রসব করলেনএকটি মেয়ে,
সুন্দর ফুট ফুটে মেয়ে।
প্রথম সন্তান এলো মদন বাবুর ঘরে।
সেই শুরু পর পর ছয় বৎসরে ছয় ছয়টি
মেয়ে।
মদন বাবু ক্রমে অস্থির হয়ে পড়ে,
একটি ছেলের খোঁজে পেলেন ছয়টি মেয়ে।
সংসার তো ক্রমে বেড়েই চলে,
এখনো আশা যদি হয় একটি ছেলে।
সৌখিন মদন বাবুর মেয়েরা ছিল সুন্দর,
ডাক নামগুলো রেখে ছিলেন খুবসুন্দর ।
লক্ষ্মী ,সরস্বতী, চান্নি,আন্নি, অনিচ্ছা,ক্ষমা,
আমরা ঐ নাম নিয়ে করতাম মজা।
লক্ষ্মী ,সরস্বতী এলেন ঘরে,
আর চাইনি তো আন্নিরে,
জোরকরে এলো অনিচ্ছা,
এবারতো করো মা ক্ষমা।
এর পরেও মদন বাবুর মনে ছিল ইচ্ছা
কিন্তু বাঁধ সাধলো
স্ত্রী গৌরীর শারীরিক অবস্থা।
শুরু হলো নানান রোগের জ্বালা,
চললো ওঝা বদ্যির কবজ মালা।
সুতিকা আর রক্ত স্রাব থামে না,
মদন বাবুরও মণ কিছুতেই মানেনা।
ডাক্তার চাইছেন জরায়ু বাদ দিতে,
মদন বাবু চাইছেন পুত্র সন্তান নিতে।
শেষে ডাক্তারের প্রচণ্ড তিরষ্কার।
অবশেষে মদন বাবু হলেন শান্ত
বাধ্য হয়ে দিলেন খান্ত।
কি আর করবেন,
একটি পুত্রসন্তান যে চাই
মদন বাবু এখন নিজেকে ভাবেন
54 বৎসরের যুবক তাই
অনেক ভেবে চিন্তে।
সূচী নামের আঠারো উনিশ বৎসরের
এক গরীব ঘরের মেয়েকে করলেন বিয়ে।
কিন্তু মদন বাবুর সকল চেষ্টা করে বিফল
দ্বিতীয় স্ত্রীর কোলেও একে একে দুটি
কন্যা সন্তান এলো।
বংশ রক্ষা হবে কীকরে তার চিন্তা, এবং
এদিকে প্রথম স্ত্রী প্রায় অকেজো হোয়ে পড়লেন।
এতো চেষ্টা করেও পেলেন না ছেলে,
এখন প্রতিদিনের ডাক্তার ওষুধের খরচ, চিন্তায় চিন্তায় মদন বাবুর রাতের ঘুম উড়ে গেল।
তাই নেশাটা ও বেড়ে গেল।
নেশা না করলে আর ঘুম হয় না।
এমনি করেই চলছিল।
কিন্তু হঠাৎ সেইদিন মদন বাবু পেলেন,
চাকুরীর অবসরের চিঠিটা।
ভীষণ ভেঙে পড়লেন পেয়ে চিঠিটা।
টেবিলেই নুয়ে পরলো তার মাথাটা।
আফিসের সকলে মিলে,
হাসপাতালে গেলেন নিয়ে।
কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলনা তার,
ডেড সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন ডাক্তার।
বিপদ যখন আসে তখন একসাথেই আসে বোধহয়।
এই ঘটনার পরের দিনই মদন বাবুর
প্রথম স্ত্রীও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বাড়ির সকলেই প্রমাদ গুনলো।
কিহবে এখন, কেমন করে চলবে সংসার।
এহেন বিপদের পরে এলো শুভ সংবাদ,
মদন বাবুর অফিস দিল আফার।
স্ত্রী শুচি দেবী পাবেন চাকুরী এবার।
কিন্তু শুচি দেবীও আনপড়,
লেখা পড়া না জানার কারনে,
ভীষণ ভয় পেলেন এবারে।
শেষে সকলে মিলে যুক্তি করে,
বরো মেয়েই উপযুক্ত হবে।
বড়ো মেয়ে, যার ডাকনাম লক্ষ্মী ,
স্কুলের নাম অনন্যা
সেই করুক চাকুরী।
কিন্তু এখন অনন্যার বয়স কম,
আর দুই বৎসর পরে ওর বয়স্ 18 হলে ওকে কাজে নিয়ে নেবে।
কিন্তু অনন্যার মন খারাপ ওই কেরানীর
চাকুরী জীবনের কথা ভেবে।
ওরইচ্ছা এয়ারফোর্সে যোগ দেবার।
যার জন্য অনন্যা দিন রাত করে চলেছে
অক্লান্ত পরিশ্রম।
জিমন্যাস্টিক, ক্যারাটে,কুস্তি, বক্সিন,
এই সকল শিখছে পড়াশুনার সাথে সাথে।
মদন বাবুর আরো তিন মাস চাকুরী ছিল।
তাই ওই তিন মাসের পুরো মাহিনা ও পি এফ
গ্রাচুইটি যা পেল তাদিয়ে ওদের ঠিক চলছিল।
ওরা আটটি বোন পড়াশুনায় মোটা মুটি ভালো।
তবে অনন্যা সকল বিষয়েই খুব ভালো।
সেই কারনে অনন্যা উচ্চ মাধ্যমিকে
ভালো রেজাল্ট করে,
ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সে এক চান্সেই পাশকরে
যোগ দিল এয়ারফোর্সে ।
এবার পরা পড়শী,আত্মীয় স্বজন
অনন্যাকে করলো ব্যতিব্যস্ত,
বিয়ে করার জন্য।
এবারে অনন্যা ও ওদের চার বোন মিলে
ঠিক করলো যে ওরা কেউ করবেনা বিয়ে।
এবং এমন কিছু করবে যাতে করে গরীব মেয়েরা হতে পারে স্বাবলম্বী।
সেদিন ওরা করলো সংকল্প
গড়ে তুলতে নুতন এক সমাজ।
এমন নুতন চিন্তাধারায় ওদের মা
শুচি দেবী হলেন ভীষণ খুশি,
এবং ওদের সহায়তার জন্য
সাহস যোগাতে এলেন এগিয়ে।
শুচি দেবীর বাবার ছিল কিছু জমি।
শুচি দেবি ওর বাবা মায়ের এক মাত্র সন্তান,
তাই ইও জমি টুকু শুচি দেবীর বাবা
শুচি দেবীর নামেই নামেই লিখে দিয়ে যান।
শুচি দেবীর ইচ্ছা ও তার মেদের
ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শুচি দেবীর জমিতে
গড়ে উঠলো এক অসাধারণ স্কুল।
ওরা চার বোন মিলে আসে পাশের গ্রামের
গরীব মেয়েদের নিয়ে স্কুল শুরু করলো।
দেখতে দেখতে স্কুলে বেশ অনেক ছাত্রী হলো।
স্কুলে লেখা পড়ার সাথে সাথে জিমন্যাস্টিক, ক্যারাটে,কুস্তি,বক্সিন, সকলি শেখানো শুরু করলো।
ওদের মধ্যে কেবল ওদের সেজো বোন
পড়াশুনায় ভীষণ ফাঁকিবাজ ছিল।
তাই ওই আট বোনের মধ্যে ওই সেজে বোন
নিজে এক স্কুল মাস্টার কে বিয়ে করে সংসার করলো ।
বাকি ওরা ছয় বোন মিলে স্কুল চালাতে লাগলো।
দেখতে দেখতে স্কুলের বেশ নাম ডাক হল।
কারন এখনকার প্রতিটি মেয়ে।
সকলেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠলো।
আসে পাশের দুর দুর গ্রাম থেকে মেয়েরা
" গৌরী মাতা শুচি শিক্ষা অবৈতনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান" এতে পড়তে আসতে লাগলো।
অনন্যার আয়ের আশি ভাগ স্কুলে ব্যয় করতো।বাকি টুকু দিয়ে ওরা ছয় বোন
আনন্দে স্বাধীন ভাবে চলতো।
সকল মানুষের মুখে একটি কথাই লেগে থাকত। মদন বাবু নেশা করলেও সাতটি রত্ন রেখে গেছেন।
সত্যই ওরা আজ কেবল সমাজের রত্নই নয় অনপেক্ষ ও বটে।
ওরা স্বাধীন ও অনপেক্ষ।
বর্তমান সমাজে ওরা পেরেছে ।
আপ্রাণ চেষ্টা করছে প্রতিটি মেয়েকে ওদের মতন বা ওদের থেকেও ভালো ভাবে বাঁচার পথ দেখাতে।
যাতে করে ওদের কখনোই কাউকে অন্যের উপরে নির্ভর হতে না হয়।
ওরা আজ সত্যই অনপেক্ষ।
<---©-আদ্যনাথ--->
【--anrc 23/02/2019--】
【=রাত্রি:01:08:22=am】 【=বেলঘড়িয়া=কোলকাতা -56=】
=========================
Comments
Post a Comment