609>|| আইসিস এবং ওসিরিস ||



     609>|| আইসিস এবং ওসিরিস ||
                           anrc
     প্রাচীন মিসরের প্রথম মমি।
                               <--©--●আদ্যনাথ ●--->

মিসরের কথা চিন্তা করলেই  মনে আসে মরুভূমি , পিরামিড , মমি ও স্ফীঙস বা স্ফিংস নিয়ে 
নানান গল্প কথা।  এই গল্প কথার মধ্যেই পাওয়াযায় মিসরের  প্রথম মমি তৈরির ইতিহাস।
আর সেই সকল জানতে হলে আগে জানতে হবে আইসিস এবং ওসিরিসের কাহিনী।

মানব ইতিহাসে প্রাচীন মিসর ছিল সবচেয়ে লম্বা সময়ের সভ্যতা, যা 3000 বছরের বেশি  টিকে ছিল।
প্রাচীন মিশরীয়রা  অনেক দেব দেবীর পুজো করতেন , তার মধ্যে আইসিস এবং ওসিরিস ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়।
বিভিন্ন  সময়ে বিভিন্ন  লেখক , কাহিনিকার,  ইতিহাস বিদ গণের  লেখা থেকে জানাযায়,
হাজার বৎসরের প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বহু কিছুই আজও রহস্যমণ্ডিত।
এছাড়াও আছে  মিসরীয় দেব-দেবীদের নিয়ে প্রচলিত  নানা গল্পো কথা।

আর এই গপ্ল কথার দেশ ঘুরে দেখতেই গিয়েছিলাম উত্তর আফ্রিকার মিসর
নীলনদের দেশে।
আজ মিশর ঘুরে দেখতে এসে প্রথমেই  আইসিসের টেম্পলে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড
পোগ্রাম দেখতে দেখতে ও পরের দিন  সম্পূর্ণ মন্দিরটি দিনের আলোতে ভাসলো করে
দেখে মনে পরে যায় অনেক দিন আগে কিছু  বইতে  পড়েছিলাম  মিশরের  দেবী  আইসিস এবং দেবতা ওসিরিসের গল্প।
মনে পড়েযায় ঠিক যেন ঠাকুরমা, দিদিমার মুখে শোনা রাজপুত্র পক্ষীরাজ ঘোড়ার
আরো কত গল্প।
মিশরীয় গল্পো গুলিও ঠিক যেন আমাদের ছোট বেলায় শোনা ঐসকল গল্পের মতন।
আজ আইসিসের কাহিনী লিখতে বসে মনে হলো আইসিসের গল্পের শেষ কোথায়
সেটা জানিনা।
তথাপি  যেটুকু জানতে পারলাম তা হল এইরকম ---
লিখিত ভাবে আইসিসের উপাসনার উল্লেখ পাওয়া যায় পঞ্চম রাজবংশের সময়ে।

প্রাচীন রোমের গল্প কথায় পাওয়া যায়।
পৃথিবীর অধিপতি ছিলেন গ্যাব/বা গেব ও তার পত্নী নাট/বা নুট  যিনি
আকাশ, তারা ও চন্দ্রের দেবী ছিলেন।
এই নাট ও গ্যবের  কোনো সন্তানাদি ছিল না।

মিথ তাদের মনে করিয়ে দিলো যে  রিও নামক এক জ্যোতিষী তাদেরকে অভিশাপ  দিয়ে ছিল ।
সেই  কারণেই  তাদের কোন সন্তান হবে  না। সেই   কারণে  নাট ও গ্যাবের মনে দুঃখ ছিল।
তারা সন্তানের জন্য নানান পূজা পাঠ করেন।
শেষে সন্তানের  জন্য নাট দ্রোহের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন । দ্রোহ জানতেন ঠিক কী কারণে
জোতিষী রিও তাদের অভিশাপ দিয়েছিলেন। নাটের প্রতি সদয়  হয়ে  দ্রোহ নাটের সন্তান
কামনায় গেলেন চাঁদ ও খড়ার দেবতা কোনসুর কাছে।
কোনসু রিও অভিশাপ তুলে দেয়।

তার পরেই নাট ও  গ্যবের  সুখের দিন ফিরে আসে। নাটের  একে একে চার টি সন্তান হয়।
প্রথমে জন্ম নেয় ওসিরিস, দ্বিতীয় সন্তান ডার্ক সিথ, তৃতীয় কন্যা সন্তান আইসিস, চতুর্থ কন্যা সন্তান হিসেবে জন্ম নিল নেপসিস /বা নেফ্‌থিস।

গ্যাব যখন যুবক তখন  পৃথিবীর দেবতা গ্যাব বার্ধক্যের কারণে  তাঁর দুই পুত্রের ভিতর রাজত্ব ভাগ করে দেন। এই ভাগ অনুসারে সেথ্ পান মিশরের উত্তর ভাগ এবং ওসিরিস পান দক্ষিণ ভাগ। কিন্তু সেথ্ ছিল প্রচণ্ড লোভী তাই সে এই ভাগাভাগি স্বীকার নাকরে, পুরো মিশরই দাবী করে বসেন। পরে গ্যাব সেথ্‌কে মন্দ শাসক বিবেচনা করে ক্রোধে ওসিরিসকে পুরো রাজ্য দান করেন।
ওসিরিস প্রাপ্ত বয়োসে  নিজের বোন আইসিস কে বিবাহ করেন।
 আইসিসের  একটি পুত্র সন্তান হয়। এই সন্তানের নাম হোরাস।

সে কালে মিসরে ভাই-বোন বিয়ে প্রচলিত ছিল (মিসরের আইন অনুযায়ী ভাই বা পুত্র যেকোনো একজনকে অংশীদার করতেই হতো, এ ক্ষেত্রে বয়স কোনো ব্যাপারই নয়)।

আইসিস ও ওসিরিসের যখন প্রথম রাজ  সিংহাসনে বসেন   সময়ে মিসরের সভ্যতা  বিকশিত হয়নি। সে সময় হানাহানি, হত্যা, লুণ্ঠন, খুন ছিল সাধারণ ব্যাপার। দুর্ভিক্ষ, বন্যা, খরা ছিল মিসরবাসীর নিত্যসঙ্গী।
ওসিরিস রাজা হলে আইসিস রানী হয়ে প্রথমেই দেশবাসীর কল্যাণের জন্য আইসিস নানান  ধরনের ফসল চাষের উদ্ভাবন করেছিলেন। ওসিরিসের সহায়তা আর আইসিসের বুদ্ধিতে জনগণ নতুন পদ্ধতির ফসল উৎপাদন করতে শিখল। দূর হয়ে গেল মিসরবাসীর দুঃখ-দুর্দশা। শুধু তাই নয়, ওসিরিস ও আইসিস জনগণের জন্য তৈরি করেছিলেন আইন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মৈত্রীও উপাসনার জন্য তৈরি করলেন  গির্জা ও মন্দির।ক্রমে মিসর সভ্য জাতিতে পরিণত হলো। আইসিস ও ওসিরিস সবার মধ্যমণি হয়ে উঠলেন। তাদের নাম চারিদিক প্রসারিত হল।

কিন্তু তাদের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠল সিথ। শয়তানের দেবতা সিথ সিদ্ধান্ত নিল আইসিস ও ওসিরিসকে হত্যা করবে। কিন্তু ওসিরিস তার ভাই শয়তানের দেবতা সিথের চক্রান্ত টের পেয়ে সব সময় সতর্ক থাকতে বলল।
সিথ কোন ভাবেই সফলতা না পেয়ে একদিন ওসিরিস কে তার নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানালেন । ভাইয়ের অনুরোধে একজন সঙ্গীসহ ওসিরিস সিথের প্রাসাদে গেল। সিথ ওসিরিসের সম্মানে নৈশভোজ নৃত্য পরিবেশনের আয়োজন করেন। প্রথম পরিকল্পনায় সিথ হত্যা করতে পারে না ওসিরিসকে। এরপর পরিকল্পনা পাল্টালো।

একদিন  নীল নদের উপকূলে যখন ওসিরিস সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করে তখনই শয়তান সিথ ওসিরিস ও তার সঙ্গীকে সিন্দুকের মধ্য পুরে নীল নদে ভাসিয়ে দেয়। নীল নদের জলে ভাসতে ভাসতে দেবতা ওসিরিস পিউনিসিয়ার ব্যাবলস শহরের সমুদ্র বন্দরে এসে পৌঁছে। খবরটি রাজা ম্যান কিলারভার ও রানীর কাছে দ্রুত পৌঁছে যায়। তারা দেবতা ওসিরিসের লাশ ও সিন্দুক অতি যত্নের সঙ্গে সংগ্রহ করে। এ খবর আইসিসের কানেও পৌঁছায়। স্বামীর শোকে শোকাহত আইসিস পিউনিসিয়ায় পৌঁছে ওসিরিসের মৃতদেহ গ্রহণ করে। প্রতিশোধের নেশায় জ্বলতে থাকে আইসিস ও তার ছেলে হোরাস। আইসিস ছিল অসম্ভব সুন্দরী, ম্যাজিশিয়ান ও ঐশ্বরিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তিনি ওসিরিসের দাফন না করিয়ে মৃতদেহকে গভীর রাতে নীল নদের উপকণ্ঠে এনে গভীর ধ্যানে মগ্ন হন। হঠাৎ আকাশ থেকে আলোকোজ্জ্বল্য আভা এসে মৃতদেহের ওপরে ঠিকরে পড়লে মুহূর্তেই জীবিত হয়ে যায় ওসিরিস। মৃত পিতাকে জীবিত পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় হোরাস।। আবেগে আপ্লুত হয় আইসিস। দেবতা ওসিরিস ছেলে  হোরাসকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে শয়তান সিথের বিরুদ্ধে। যুদ্ধে হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয় উভয়পক্ষের। শেষে প্রাণ হারায় সিথ।
 সিথের সব পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে যায় । ওসিরিস হয়ে ওঠে মিসরীয় দেবতা আর আইসিস দেবী।  হোরাস হয় মিসরীয় রাজা।

আইসিস ছিলেন মাতৃত্বের, রক্ষাকারী এবং নিরাময়কারী দেবী।
ওসিরিস ছিলেন মৃতপুরীর রাজা এবং পরজন্মের দেবতা ।
সিথ ছিলেন মরুভূমি, বিশৃংখলা এবং ঝড়ের খারাপ দেবতা। সিথে স্ত্রী ছিলেন তার সহদর
বোন নেপসিস।
মনে করা হয় ওসিরিসের মৃত্যুর পর তার পুত্র হোরাস জন্ম নিয়েছেন ।
ওসিরিস ছিলেন পরবর্তী জীবনের দেবতা
অর্থাৎ মৃত্যুর দেবতা । এঁর গায়ের সবুজ রঙ পুনর্জন্মের প্রতীক।
আইসিসের ছেলে হোরাস ছিলেন রাজপদ নির্বাচন, যুদ্ধ,ও  শিকারের দেবতা ।
রাঃ সূর্য দেবতা

অনেকের মতে আইসিস এবং ওসিরিসের এই পৌরাণীক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে মিসরীয় অন্তষ্টিক্রিয়া ও মমি তৈরীর প্রচলন শুরু হয়।

এক সময়ে নীল নদে প্রতি বছরই বন্যা হতো । আর সবাই বিশ্বাস করতো বন্যার সেই জল হলো আইসিসের চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু।
যখন সিথ্ চক্রান্ত করে ওসিরিস কে হত্যা করে ছিলেন তখন আইসিস ভীষণ ভাবে কেদে ছিলেন।
আর আইসিসির সেই চোখের জল নীল নদের বন্যার কারন।

আইসিস  ছিলেন প্রাচীন মিশরীয় ধর্মবিশ্বাসে মাতৃত্ব, যাদু এবং ঊর্বরতার দেবী।
মিশরীয় ধর্মবিশ্বাসের দেবী হলেও, আইসিসের পূজা অর্চনা প্রাচীন মিশরের বাইরে
গ্রিক-রোমেও ছড়িয়ে পড়েছিল। আদর্শ মা, স্ত্রী, রূপে প্রকৃতি ও যাদুর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে
আইসিসের খ্যাতি ছিল এবং তার পূজা করা হত। তার পূজা করতেন সকল শ্রেণীর মানুষ,
দাস দাসী, কারীগর, পাপী তাপী অপরাধী জন থেকে শুরু করে ধনবান, অভিজাত, রাজা শাসনকর্তা, কুমারী নারী - সকলেই তার পূজা করতেন এবং তিনি সকলের প্রার্থনাই  শুনতেন।
প্রকৃত পক্ষে আইসিস ছিলেন মাতৃত্ব, যাদু এবং ঊর্বরতার দেবী।
চিত্র কর গন আইসিসকে চিত্রিত করেছেন, সিংহাসনাকৃতির মুকুট পরিহিতা নারী হিসেবে, কখনো তার পাখির মত ডানাও থাকতো।
দেবীর এক হাতে  একটি দণ্ড অন্য হাতে আঙ্খ নামক চাবি।
প্রতীক ছিল সিংহাসন, গো-শৃংগ বিশিষ্ট সূর্য চাকতি এবং সিকামোর গাছ ।

আইসিসের অন্যান্য পরিচয়ের মধ্যে রয়েছে সারল্যের দেবী, মৃতদের রক্ষাকারিনী, শিশুদের দেবী যার থেকে সবকিছুর শুরু হয়, রুটি, পানীয় এবং সবুজ ক্ষেতের দেবী।

আইসিসের দুই ভাইয়ের নাম ছিল ওসিরিস এবং সেথ্। আর এক বোনের নাম ছিল নেফ্‌থিস।
ওসিরিসের  সাথে তাঁর বিবাহ হয়।
আর সেথ বিবাহ করেন তার সহদর  বোন নেফ্‌থিস কে।
আইসিস ও ওসিরিস র  একটি পুত্র সন্তান হয়। এই সন্তানের নাম হোরাস।


আবার কোন কোন লেখক বা ইতিহাস বিদের মতে,
 রাজ্য লাভের পর ওসিরিস ও  আইসিস মিলিত রূপে দেশের কিছু উন্নতির করেন।
নুতন রূপে চাষ আবাদ , সেচের ব্যবস্থা, নানান জিনিস রপ্তানি , চিকিৎসা শাস্ত্রের সূচনা ,শিক্ষার
ব্যবস্থা ,নুতন লিপির প্রচলন ,এগুলির সাথে সাথে বিশ্বের প্রথম জাহাজ নির্মাণের কলা কৌশল
এবং আরও নানাভাবে দেশের সার্বিক বহু উন্নতি করেন। তারপরে  রাজ্য পরিচালনার ভার
আইসিসির উপরে দিয়ে ওসিরিস  রাজ্য জয়ে বের হন।এদিকে আইসিস ও  ওসিরিসের এতো
সাফল্যের কারনে সেথ হিংসার আগুনে জ্বলে আইসিস ও  ওসিরিস কে হত্যা করবার জন্য
সচেষ্ট হয়ে পড়েন।
কিছুদিন পর ওসিরিস রাজ্যে ফিরে এলে সিংহাসনের উপরই সেথ্  ওসিরিস কে হত্যা করেন।
আবার কেউ কেউ মনে করতেন  সেথ্ ওসিরিসকে হত্যা করেছিল এ্যাবিডেজের নিকটবর্তী নদিতে। সেথ্ ওসিরিসের দেহকে চৌদ্দ টুকরো করে নীল নদে নিক্ষেপ করেছিলেন। এর পরে নেফ্‌থিস ও আইসিস চিলের রূপ ধারণ করে সমগ্র নীল নদ সহ সম্পূর্ণ মিসর খুঁজে খুঁজে ওসিরিসের মৃতদেহের  টুকরো গুলি উদ্ধার ওসিরিসের নতুন জীবন দান করেন।
এরপর আইসিস ও  তাঁর পুত্র হোরাসকে নিয়ে একটি দ্বীপে লুকিয়ে থাকেন। সেথ্ এদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিলে ওই দ্বীপ থেকে পালিয়ে যান। এইভাবে পালিয়ে বেড়ানোর এক পর্যায়ে একটি বিষাক্ত সাপ হোরাসকে দংশন করে। এই বিষ থেকে হোরাসকে কেউ রক্ষা করতে সমর্থ না হলে‒থোথ্ হোরাসকে রক্ষা করেন।

লোক কথায় প্রচলিত ছিল যে যখন  ওসিরিসের  ভাই সেতের এর হাতেই  ওসিরিসের মৃত্যু হয়।
এবং  ওসিরিস দেহ টুকরো টুকরো করে জলে ভাসিয়ে দেয়।
তখন আইসিস নিজের যাদু ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সেই মৃতদেহের সমস্ত বিচ্ছিন্ন অংশ গুলো জড়ো করেন এবং তাতে প্রাণ সঞ্চালণ করেন।  এমন অদ্ভুত আশ্চর্যজনক ক্ষমতার ঘটনা মিশরীয়দের ধর্মবিশ্বাসের উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে।
এহেন ঘটনায় প্রাচীন মিশরের ওসাইরিসের পূনর্জাগরণের ঘটনায় আইসিসের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
ফলে আইসিসের নাম ও প্রভাব খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আইসিসের জিবন সঙ্গী বা স্বামী ওসিরিসের যখন মৃত্যু  হয় তখন  আইসিস ভীষণ ভাবে দুঃখ
অনুভব করে  শোকে কেঁদে ছিল। তার সেইচোখের জল ভীষণ বৃষ্টির ধারার মতন ঝরে পড়ছিলো।
আর সেই অশ্রু ধারার কারণ নীল নদ প্লাবিত হয়।

 প্রতি বছর ওসিরিসের মৃত্যু এবং পুনর্জাগরণকে বিভিন্ন রকম আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপন করা হত।ফলে প্রতি বৎসর আইসিসের চোখের  জলে  নীল নদে বন্যাও হতো ।

শুধু মিশরই নয়,মিশর ছাড়িয়ে আইসিসের পূজা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রিক-রোমান বিশ্বেও।
খ্রিস্টিয় মতবাদের প্রচার শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আইসিসের পূজা চালু ছিল সে সব অঞ্চলে।
ওসিরিসের মৃত্যুর পর তার পুত্র হোরাস জন্ম নিয়েছেন বলে গণ্য করা হয়।
ওসিরিস ছিলেন পরবর্তী জীবনের দেবতা অর্থাৎ মৃত্যুর দেবতা ।
এঁর গায়ের সবুজ রঙ পুনর্জন্মের প্রতীক।

আইসিস এবং ওসিরিসেয় গল্প কথার শেষ নাই।
কারুর মোতে এমনও বলা হয় যে বহুকাল আগের কথা।
যেদিন ওসিরিস জন্মগ্রহন করলো, সেইদিন স্বর্গ থেকে একটা দৈব বাণী নাকি সবার
কানে এসে ছিল।
"হে মানবকূল, তোমাদের প্রভুর আগমন ঘটলো এই পৃথিবীতে।"

ওসিরিসের জন্মের দুই দিন পরে তার ভাই সেত জন্মগ্রহন করলো। দুই ভাই সব দিক দিয়েই বিপরীত ছিল, তাদের ভিতর কোন দিকেই মিল ছিল না। ওসিরিসের গায়ের চামড়ার রং ছিল সবুজ,
এবং উর্বর ভূমির মতো পরিপূর্ন।
অন্যদিকে সেত এর মুখ ছিল লাল এবং প্রানহীন মরুভূমির মতো ফ্যাকাসে।
ওসিরিস শান্তি ভালবাসতো , অপরদিকে সেত পছন্দ করতো যুদ্ধ।

সেই সময়ে মিসরের প্রথম ফারাও হিসাবে "রা" শাসন করতো। যখন "রা" বৃদ্ধ হয়ে পড়লো, সে এই পৃথিবী ত্যাগ করে তার সূর্য নৌকা বেয়ে আকাশ দিয়ে স্বর্গে চলে গেলো। তারপর থেকে ওসিরিস রাজা হয়ে সেই সিংহাসনে বসলো। ওসিরিস হলো ফারাও এবং তার স্ত্রী আইসিস হলো রানী। তারা খুব ভালভাবে এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে রাজ্য পরিচালনা করতো। সারা রাজ্য জুড়ে শান্তি বিরাজ করতো।

একদিন ওসিরিস পৃথিবী ভ্রমনে বের হলো। পথে যার সাথেই দেখা হতো, তাকেই শিক্ষাদান করতো, যেখানেই সে যেতো সেখানেই যেন শান্তির পরশ লাগতো। যখন সে দেশভ্রমনে বের হতো, সে সময় তার স্ত্রী আইসিস দক্ষতার সাথে দেশ শাসন করতো। ওসিরিস যখন দেশে ফিরে আসতো, তখন সারা দেশে আনন্দ উৎসবে ভরে যেতো। আনন্দ হবেই না বা কেন? দেশের সব মানুষ ওসিরিসকে যে অনেক ভালবাসতো!
সমগ্র মিশর বাসি ওসিরিসের শাসনে খুব আনন্দে দিন কটা তো।

প্রচলিত আরো একটি গল্প কথা ------------

আইসিস ও ওসিরিস কে নিয়ে আরো একটিগল্প কথা প্রচলিত ছিল ।
 সেথ দিনের পর দিন দেখতো যে আইসিস ও ওসিরিসের নাম দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।
এতে সেথের মনে গভীর হিংসার সৃষ্টি হয়।
সেথ তখন  ওসিরিস কে হত্যা করবার জন্য গোপনে গোপনে  খুব সুন্দর একটা কফিন
তৈরী করলো। এটা ছিল চমৎকার সাজসজ্জা ও নকশা করা, ওসিরিসের দেহ রাখার জন্য এটির পরিমাপ ছিল একেবারেই মানানসই ।

ওসিরিসের সন্মানে রাজকীয় ভোঁজসভার আয়োজন করা হলো। সেত তার দলবল নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিল। ভোঁজের পরে সেত সেই বাক্সটি সেখানে হাজির করলো। উপস্থিত অতিথীরা সেই বাক্সের কারুকাজ দেখে মুগ্ধতায় হতবিহবল হয়ে পড়লো। সিলভার, সোনা আর লাপিস লাজুলী (গাঢ় নীল মূল্যবান পাথর) দিয়ে বাক্সটি এত ঝকমক করছিলো যে এটাকে দেখাচ্ছিল আকাশের মতো গাঢ় নীল এবং সেই সাথে দামী পাথরগুলো রাতের আকাশের তারার মতো জ্বলজ্বল করছিলো। সেত ঘোষনা করলো যে, যে অতিথী এই বাক্সটার ভিতরে ঠিকমতো শুতে পারবে, এই বাক্সটা সে উপহার হিসাবে পাবে। সব অতিথীরা উৎসুক হয়ে একের পর এক  বাক্সটার ভিতরে শুয়ে দেখলো।
 কিন্তু তারা কেউ সঠিক হলোনা কেউ বাক্সটার চেয়ে লম্বা অথবা কেউ ছোট, কেউ বেশী চওড়া, কেউ বেশী পাতলা  । বাক্সটার পরিমাপ কোন ভাবেই কারুর  সাথেই মিললো  না। সকলের  শেষে যখন ওসিরিসের নম্বর এলো তখন ওসিরিস  বাক্সটার কাছে এসে বললো ' আমি একটু চেষ্টা করে দেখি'। এই বলে সে বাক্সটার ভিতর যেয়ে শুয়ে পড়লো।
দেখা গেলো বাক্সটার পরিমাপ পুরোপুরি তার সাথেই মিলে গেলো। সেত সাথে সাথেই দড়াম করে বাক্সটার দরজা বন্ধ করে দিলো,ফলে ওসিরিস বাক্সটার ভিতরে আটকা পড়লো। সেতের অনুসারীরা ঝড়ের বেগে বাক্স টেনে নিয়ে গিয়ে  পেরেক দিয়ে বন্ধ করে দিল ।
সেতের লোকজনের  ওসিরিসসহ বাক্সটি সর্বশক্তি দিয়ে নাইল নদীতে ছুড়ে ফেললো। নদীর অন্ধকারাচ্ছন জলে তে বাক্সটি তলিয়ে গেলো। এভাবেই শেষ হয়ে গেলো মহৎ রাজা ওসিরিসের জীবন।

যখন আইসিস বুঝতে পারলো তার প্রিয়তম স্বামীর কপালে কি ঘটেছে, তখন সে বুক চাপড়িয়ে কান্না শুরু করলো। কিন্তু কান্নাভেজা চোখে বিধবা রানী প্রতিজ্ঞা করলো 'মানুষ মরে যায়, কিন্তু ভালবাসা বেঁচে থাকে। আমি ওসিরিসের জন্য সমস্ত মিসর তন্ন তন্ন করে খুঁজবো, এবং তাকে খুঁজে বের করবোই'।

আইসিস জানতো যে, নিয়মমাফিক মৃতদেহ সৎকার না করলে ওসিরিসের আত্মা কখনোই মুক্ত হয়ে পরকালে যেতে পারবে না।
আইসিস সন্ধান অভিযান শুরু করলো। আর যখনই সে সন্ধানে চলে গেলো, সেত তখনই সিংহাসন দখল করলো।
সেথের  শাসন ছিল ভয়ানক হিংস্র আর নির্মম। আইসিস বাধ্য হলো নীল নদের  ব-দ্বীপে অবস্থিত জলাভূমি আর বনের ভিতর আশ্রয় গ্রহন করতে। সেখানে জন্ম নিলো তার আর ওসিরিসের ছেলে হোরাস। প্রথম থেকেই আইসিস তার ছেলেকে মাতৃসেবা দিতে লাগলো। কিন্তু একসময় তার মনে হলো, যদি সেত তার ছেলেকে দেখে ফেলে তাহলে মেরেই ফেলবে। তাই আইসিস সেখানকার তার বিশ্বস্ত এক দয়ালু দেবীর কাছে ছেলেকে লালন পালনের জন্য রেখে গেলো।

ওসিরিসের মৃতদেহ খুঁজতে খুঁজতে আইসিস অনেক অনেক দুরে চলে গেলো, একটুও বিশ্রাম নেই। পথে যাকেই পায়  তাকেই ওসিরিসের হদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো।

বহুদিন ধরে সে বৃথাই খুঁজে ফিরলো। একদিন ছোট ছেলেমেয়ের একটা দলের সাথে তার দেখা হলো। তারা একটা বাক্সের উপরাংশ নদীতে ভাসতে ভাসতে সাগরের দিকে চলে যেতে দেখেছিল। জলের প্রবল স্রোত সেই বাক্সটি ভাসিয়ে নিয়ে লেবাননের তীর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল, তারপর মৃদু ঢেউ এসে সেই বাক্সটিকে একটা ছোট চিরসবুজ ঝাউ গাছের গোঁড়ায় রেখে দিলো। অলৌলিক ভাবে গাছটির শাখা প্রশাখা দেখতে দেখতে বড় হয়ে বাক্সটির চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেয়ে সেটিকে তার নিজের কান্ডের ভিতরে এমনভাবে রেখে দিলো যাতে বাইরে থেকে একটুও দেখা না যায়।

দেখতে দেখতে সেই অদ্ভুত গাছটি অনেক লম্বা ও মজবুত হয়ে গেলো, সেই সাথে সুগন্ধি ছড়াতে থাকলো। একদিন এই গাছের সুখ্যাতি সেখানকার রাজার কানে গেলো। রাজা যখন এই গাছটি দেখলো, তখনই সে হুকুম করলোঃ

গাছটি কেটে ফেলো, এটিকে একটা স্তম্ভ করে আমার প্রাসাদে রাখবো। ফলে  গাছের কান্ডটি সেখানকার রাজার রাজপ্রাসাদে স্থান পেলো, কিন্তু এটির রহস্য তার ভিতরেই নিরাপদে রইলো।
আইসিস তাড়াতাড়ি লেবাননে পাড়ি দিলো। সেখানকার রানীর পরিচারিকার সাথে তার বন্ধুত্ব হলো, কিভাবে বিভিন্ন উপায়ে চুল বাঁধা যায় আর বুননকার্য করা যায় তা নিয়েই মূলত গল্প করতো। চুলের বুননকার্যের উপর তার এই সব গুন দেখে সেখানকার রানী খুবই খুশী হয়ে আইসিসকে তার প্রাসাদে রেখে দিলো।
কিন্তু পরিচারিকারা রানীকে বললো যে, প্রতিরাতেই আইসিস তাদেরকে ঘর থেকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে দরজা আটকে রাখে, এবং তারা ঘর থেকে বিচিত্র শব্দ শুনতে পায় যা অনেকটা পাখীর কিচিরমিচির শব্দের মতো।

একরাতে রানী সেই ঘরে লুকিয়ে রইলো। তার চোখ যেন বিস্ফোরিত হয়ে গেলো যখন সে দেখলো আইসিস একটি পাখীতে রূপান্তর হয়ে স্তম্ভের চারদিকে উড়ে বেড়াতে লাগলো, যে স্তম্ভের ভিতরে তার স্বামী আটকে আছে, আর দুঃখের গান গাইতে থাকলো।
আইসিসের সত্যিকারের দেবীর রূপ দেখে তার পদতলে লেবাননের রানী হাটু গেড়ে বসে পড়লো।
বিস্ফোরিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো 'দেবী রানী! আপনি এখানে?'
আইসিস করুনার স্বরে বললো 'আমি তোমায় আশির্বাদ দেবো, যদি তুমি এই স্তম্ভটি আমায় দাও'।
এরপরেই আদেশ হলো স্তম্ভটি নামিয়ে ফেলার। সেখানকার রাজার লোকেরা গাছের সেই বৃহৎ কান্ডটি কেটে ফেললো।
আইসিস তার স্বামীর কফিনটি বের করলো, আর সেটার উপর উপুড় হয়ে কেঁদে কেঁদে চোখের জলেতে ভাসিয়ে দিল।

সে কফিনটিকে একটি নৌকাতে নিয়ে চলে গেল।
আইসিস অধীর হয়ে অপেক্ষা করে ছিল কখন ওসিরিসের মুখখানা দেখবে। যখনই সে একা হলো, কফিনের দরজাটা খুলে ফেললো, সেখানে শুয়ে আছে প্রিয়তম ওসিরিস। কিন্তু মৃত। ওসিরিসকে ধরে আইসিস ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকলো, তার চোখের উষ্ণ জল প্রিয়তম স্বামীর শীতল মুখে পড়তে থাকলো।
আইসিস মিসরে পৌছানোর পরে কফিনটিকে নাইল নদীর ব-দ্বীপের জলাভূমির ভেতর লুকিয়ে রেখে দিয়ে সে তার ছেলেকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছুটে গেলো।
কিন্তু দূর্ভাগ্য যেন তার পিছ ছাড়লোনা। সেই রাতেই সেথ  যেন ছায়ার মতো পিছে পিছে এলো।
সেত যখন কফিনের কাছে গেল, দেখেই সে বুঝতে পারলো। রাগে ক্ষোভে গর্জে উঠে সে ওসিরিসের মৃতদেহ কফিন থেকে হ্যাচকা টান দিয়ে বের করে আনলো। 'এইবার তুই আর ফিরে আসতে পারবি না' চিৎকার করে বলেই ওসিরিসের শরীরকে কেটে কেটে 14 ভাগ করলো। সেত উপহাসের সুরে বললো 'এইবার আইসিস আর তোকে রক্ষা করতে পারবে না', এই কথা বলে ওসিরিসের 14 ভাগ করা শরীরখন্ডকে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দিলো।
আইসিস এমনিতেই অনেক কষ্ট সয়েছে, এখন এই দৃশ্য দেখে তার চোখ থেকে বৃষ্টির মতো এমন জল ঝরতে লাগলো  যার ফলে নীল নদীতে বন্যা বয়ে গেলো।

আইসিস তখন প্যাপিরাস দিয়ে নিজেই একটা নৌকা বানিয়ে নাইল নদীর আশে পাশের সব জলাভূমিতে তার স্বামীর শরীরের টুকরা তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ালো। ওসিরিসের শরীরের প্রতিটা টুকরো আইসিস খুঁজে বের করে একসাথে করলো।

তারপরে আইসিস এবং তার বোন নেপথীস ওসিরিসের মৃতদেহের পাশে বসে উঁচু স্বরে উপাসনা করতে লাগলো।( নেপথীস   ছিলো সেথ এর স্ত্রী কিন্তু সেথের নানান কু কর্মের কারণ নেপথীস
সেথ কে ত্যাগ করে আইসিসির সাথে যোগ দিয়ে ছিলো )
 আইসিস ও  নেপথীসের  করুন অসহায় বিলাপ আকাশ ভেদ করে  স্বর্গে পৌঁছালো। তাদের বিলাপ সূর্যদেবতা রা এর কানে গিয়ে  পৌছাল, আইসিসের জন্য তার মায়া হলো। সে তখন দেবতা আনুবিস এবং থোথকে পাঠালো আইসিসকে সাহায্য করতে। তারা ওসিরিসের সমস্ত শরীরকে সাদা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ঔষধী তেলের ভিতর রেখে দিলো।
এটাই ছিল মিসরের প্রথম মমি।*#*#*#*#

এরপরে আইসিস একটা বড় অলৌলিক কাজ করলো, যেটা আগে কেউ কখনো দেখে নাই।
আইসিস  তার দুই হাত প্রসারিত করলো ,এবং দেখতে দেখতে তার হাত দুটি অসাধারন সুন্দর
দুটি পাখায় পরিনত হলো। সে তখন ওসিরিসের মৃত শরীরের উপরে উড়ে গিয়ে  তার পাখা দিয়ে বাতাস দিতে লাগলো, সেই বাতাস ওসিরিসের নাকের ভিতর ঢুকে যেতেই সে নিশ্বাস নিলো,
পরক্ষনেই আবার বের করলো।

নিশ্বাস বের হওয়ার সাথে সাথেই ওসিরিসের আত্মা শেষ পর্যন্ত মুক্ত হয়ে মৃতদের জগতে চলে গেলো, আর সেই মৃতভূমিতে সবার বিচারক আর রাজা হিসাবে সে শাসন করতেহ শুরু করলো।

আইসিস নীল নদের এক ব-দ্বীপে ফিরে গেলো, যেখানে তার ছেলেকে রেখে গিয়েছিলো।
এর ভিতর অনেক বছর কেটে গেলো। হোরাস, যার কিনা মিসরের প্রকৃত রাজা হওয়ার কথা, অনেক শক্তিশালী আর সাহসী হয়েছে। ওসিরিস মাঝে মাঝে পরকাল থেকে ছেলেকে দেখতে আসে, আর যুদ্ধ করার কলা কৌশল শিখিয়ে দেয়। হোরাস তার পিতার জন্য প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিজ্ঞা করে।
এক সময় হোরাস তার শত্রূ কে  হারানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। শুরু হয় সেতের সাথে যুদ্ধ। দিনের পর দিন চলে যায় যুদ্ধ করতে করতে। অনেকেই বলে যে, হোরাস দেবতাদের অনুরোধ করেছিল তাকে সাহায্য করতে, আর সূর্যের মতো জ্বলন্ত আগুনের গোলায় রূপান্তর করে দেওয়ার জন্য। সে রূপান্তরিত হয় সূর্যের মতো জ্বলন্ত আগুনের গোলায়, সেই গোলার সাথে ছিল আগুনের পাখা। সেই প্রচন্ড আলোতে সেতের সৈন্য সামন্ত  অন্ধ হয়ে একেবারেই
অসহায়  হয়ে গেলো, তারা তখন নিজেরাই একে অন্যকে মারতে লাগলো।
কিন্তু সেতকে হারানো এত সহজ নয়। সে নিজে তার শক্তিশালী অলৌলিক ক্ষমতাগুলো প্রয়োগ করা শুরু করলো।
তার সৈন্যসামন্তদের বিশাল জলহস্তী আর কুমিরে রূপান্তর করে ফেললো। তারা নীল  নদীতে নীরবে ঘাপটি মেরে হোরাসের নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো।
হোরাস যখন নীল নদীতে এলো, তার নিজের দলের মানুষদের সব প্রস্তুতি নেয়া ছিল। তাদের ছিল লোহার তৈরী বল্লম আর শিকল, সেই সাথে অলৌলিক ক্ষমতার শক্তি। নদীতে লুকিয়ে থাকা সেতের বিশাল জন্তুগুলোকে শিকল দিয়ে টেনে এনে বল্লম দিয়ে গেথে ফেললো।

 সেত যখন বুঝতে পারলো ও দেখলো তার সব জন্তুগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছে,তখন সে এমন জোরে চিৎকার করলো যে, বজ্রপাতের মতো মাটি কেঁপে উঠলো। 'হোরাসকে খুন করবো' বলতে বলতে নিজেকে কুৎসিত একটা দানবে রূপান্তর করলো, তার গলিত মাথা থেকে দূর্ঘন্ধযুক্ত রস পড়তে লাগলো। হোরাস এক কোপে সেতের মাথা আলাদা করে ফেলে শরীরটাকে কেটে টুকরো টুকরো করলো। এভাবেই ঘৃন্য দানবসদৃশ সেতের জীবনাবসান হলো।

হোরাসের জয় হলো। এই প্রথম বারের মতো সে তার বাবা ওসিরিসের সিংহাসনে বসলো। হোরাস তার বাবার মতোই প্রবল বুদ্ধিমত্তা আর সুখে শান্তিতে সাথে দেশ শাসন করলো।
এইভাবে প্রাচীন মিশরের দেবতারা নিজের মতন করে সুন্দর সমাজ গড়ে ,মানুষকে
শিক্ষায়, কৃষি কলায়,এবং সকল দিক থেকে সুন্দর ভাবে বাঁচতে শিখিয়ে, বহুদিন
 শাসন করার পরে এক সময় মানব সমাজের হাতে মর্তের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে তারা
সবাই স্বর্গে চলে গেলো ।

এমন আরো কত গল্প কথা যে মিশরের মানুষদের মধ্যে প্রচলিত ছিল তা আর বলে বা
লিখে শেষ করা সম্ভব নয়।
হাজার বছরের প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অনেক কিছুই আজও রহস্যমণ্ডিত। মিসরীয় দেব-দেবীদের নিয়েও প্রচলিত আছে নানা কাহিনী আর রটনার।

অনেকেই দাবি করেন মিসরের সর্বশেষ সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা নিজেকে আইসিসের মানবী সংস্করণ এবং মার্ক অ্যান্টনিকে ওরিসিসের মানব সংস্করণ।

   ======আজ এই পর্যন্তই ।=======
কারন আইসিসের গল্প কথার কোন শেষ
নাই।
মনে হয় যুগের পরিবর্তনে আজও  এই আইসিসের জীবন কথা ও প্রাচীন মিশরের
গল্প কথা নুতন নুতন ভাবনার প্রবাহে নুতন ঢেউ নিয়ে নুতন রূপে রঙে প্রকাশিত হচ্ছে।
তাই এই কথার শেষ নাই।
একথা প্রাচীন মানবের উত্থানের কথা একথার শেষ
 নাই। 
আজ 10/01/2021 তারিখে আবার একটি কাহিনী খুঁজে পেলাম।
এই কাহিনীটি ও বেশ রোমসঞ্চ কর কাহিনী সেই কারণে লিখে রাখলাম।



প্রাচীন মিশর;:----
 
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা  মানেই অদ্ভুত আর রহস্যময় নানা উপকথার ভাণ্ডার। তাদের এসব গল্প শুধু যে বিংশ শতাব্দীকে চমকেই দিচ্ছে, তা কিন্তু নয়। এর মধ্যে ছড়িয়ে আছে সেকালের সমাজবিজ্ঞান, জ্যোতিষ, গণিত এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্রেরও ভ্রূণ। এছাড়াও প্রকৃতির সমস্ত রহস্যকেই ভিন্ন ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন নামে চরিত্রায়ণ করে এই উপকথাগুলো। 'ওসাইরিস ' তেমনই এক আশ্চর্য জীবনের গল্প। 
বিস্ময়কর এক চরিত্র এটি। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন মমি বলে ধারণা করা হয় ওসাইরিসের মমিকে। গবেষকদের ধারণা মিশরীয়দের মমির অধ্যায় শুরু হয়েছিল ওসাইরিসের থেকে। ওসাইরিস বা ওসিরিসকে নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত আলোচনাগুলো করেছেন গ্রিক পন্ডিত ডিওডোরাস ও প্লুটার্ক। যদিও তার বহু আগে থেকেই পিরামিড গাত্রে খোদাই করা হয়েছে ওসাইরিসের জীবনকাহিনী। সেইসব পিরামিড স্টোরি থেকেই প্রথম জানা যায় ওসাইরিসের জীবন, হত্যাচক্রান্ত ও পুনরুত্থানের গল্প। পুরাণের মতে মিশর ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো মমিও ওসাইরিস।

প্রাচীন মিশরে দুই হাজারেরও বেশি দেব দেবীর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়
প্রাচীন মিশরে দুই হাজারেরও বেশি দেব দেবীর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়

প্যাপিরাস সল্ট থেকে মৃতদেহ মমি করে পচনরোধের যে বিজ্ঞান, তারও প্রথম হাতেকলমে ব্যবহার হয় ওসাইরিসের উপরই। তবে ওসাইরিসের কথায় আসার আগে, আসুন জেনে নেয়া যাক কে এই ওরাইসিস? কোথা থেকে জন্ম তার? পৃথিবীর দেবতা গেব বিয়ে করেন তার বোন আকাশ আর স্বর্গের দেবী নুটকে। ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে প্রাচীন মিশরে খুবই পবিত্র বলে মনে করা হত ৷ রক্তের বিশুদ্ধতা ধরে রাখার জন্য মিশরের রাজপরিবারগুলোতে  প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভাইয়ের সঙ্গে বোনের বিয়ে হয়ে এসেছে। এমনকি বাবার সঙ্গে মেয়ের। বিয়ের পর যৌথজীবনে ঢুকে দেবতা গেব ও নুট একে একে জন্ম দিলেন চার ছেলেমেয়ের।

এই চার সন্তানের মধ্যে প্রথম জনই হলেন দেবতা ওসাইরিস বা ওসিরিস। মিশরীয় পুরাণ অনুসারে পুনর্জন্ম, মদ, শস্য তথা উর্বরতার দেবতা ছিলেন ওসাইরিস। পৃথিবী ও আকাশের সঙ্গমে তার জন্ম, প্রকৃতির সম্মিলিত শক্তির প্রতীক বলা চলে তাকে। বয়ঃপ্রাপ্তির পর নিজের সহোদরা বোন সুন্দরী আইসিসকে বিয়ে করেন ওসাইরিস। আইসিস ছিলেন যাদুবিদ্যা, মাতৃত্ব ও প্রকৃতির দেবী। সারল্য আর শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী দেবীও তিনি। মিশরের রাজা মানে ফারাওদের বলা হত 'আইসিসের সন্তান'।


গেবের দ্বিতীয় পুত্র, ওসাইরিসের ভাই সেথ ছিলেন মরুভূমি, ঝড় আর অন্ধকারের দেবতা। ছোটোবেলা থেকেই সেথ অহংকারী, দুর্দমনীয়, কপট। গেব তার দুই পুত্রের মধ্যে রাজত্ব ভাগ করে দিতে চেয়েছিলেন। সেই অনুসারে ঠিক হল মিশরের দক্ষিণ অংশ বড় ভাই ওসাইরিসের দখলে থাকবে। আর উত্তর অংশ থাকবে কনিষ্ঠ সেথের দখলে। তবে ভাগাভাগিতে আপত্তি ছিল সেথের। সে চেয়ে বসল সম্পূর্ণ মিশরের আধিপত্য। এই অসঙ্গত দাবিতে রুষ্ট হয়ে এবং তার অপশাসনের প্রমাণ পেয়ে বাবা গেব ওসাইরিসকেই সমগ্র মিশরের একছত্র অধিপতি ঘোষণা করেন।

রাজা হিসেবে ওসাইরিস ছিলেন প্রজাদরদি, সুশাসক। যে সময় তিনি সিংহাসনে বসেন, তখন প্রাচীন মিশরের মানুষ ছিল বর্বর। মানুষ মানুষেরই কাঁচা মাংস খেত। নিজেরও এটি প্রিয় খাবার হলেও রীতি বাতিল করলেন নিজেই। আসলে সেসময় মিশরে এমন আরো অনেক কিছুই রীতি হিসেবে মানা হত। এরপর মিশরীয়দের চাষবাস করতে শেখালেন তিনি। ফলাতে শেখালেন গম, বার্লি, আঙুর। তৈরি করলেন উৎকৃষ্ট মদ। শুধু সুসভ্য করাই নয়, কৃষিকাজ এবং তামার ব্যবহার সম্পর্কেও মিশরীয়দের শিক্ষিত করে তোলেন রাজা ওসাইরিস।  

বর্বর প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে নিয়ে আসেন শৃঙ্খলা। গড়ে তোলেন প্রশাসক, স্থপতি ও কৃষিবিজ্ঞানীদের ফৌজ। সমাজের নিয়মকানুন, আইন-শৃঙ্খলা প্রণয়ন করতে তার আমন্ত্রণে এগিয়ে আসেন জ্ঞানের দেবতা থোথও। দুই দেবতায় মিলে শিল্পকলা আর বিজ্ঞানে পারদর্শী করে তোলেন মিশরবাসীকে। পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন ওসাইরিস ও আইসিস। যখনই রাজ্য ছেড়ে অন্য দেশ ভ্রমণে যেতেন রাজা, রাজত্বভার দিয়ে যেতেন রানি আইসিসের উপর। তবে সুখ জিনিসটাই ক্ষণস্থায়ী।

এই দুই দেবতার সুখী দাম্পত্যেও কাঁটা হয়ে দাঁড়াল তাদেরই লোভী ভাই সেথ। তারও আগে ওসাইরিস নিজেই ভ্রান্তিবশত জড়িয়ে পড়লেন সেথের স্ত্রী নেফথিসের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে, যার পরিণামে তাদের একটি ছেলে জন্মায়। এই অবৈধ সন্তানই শেয়াল - দেবতা আনুবিস। গেব ও নুটের ছোট মেয়ে ছিলেন নেপথিসা ওসাইরিস ও আইসিসের মতো নেপথিসও বিয়ে করেন নিজের দাদা অন্ধকারের দেবতা সেথকে।

উশৃঙ্খল ও হিংস্র হিসেবে দুর্নাম আছে দেবতা সেথের


এদিকে নেপথিসের গোপন দুর্বলতা ছিল বড়ভাই ওসাইরিসের উপর। তবে ওসাইরিস ছিলেন স্ত্রীর প্রতি একনিষ্ঠ। অন্যের প্রেমপ্রস্তাবে সাড়া দেবেন না। তাই অন্য ফন্দি আঁটলেন দেবী নেপথিস। একদিন তিনি আইসিসের ছদ্মবেশে হাতে পানপাত্র নিয়ে গেলেন ওসাইরিসের ঘরে। একে ছদ্মবেশ, তার উপর মদের প্রভাব, চিনতে ভুল করলেন ওসাইরিস। মিলিত হলেন নেফথিসের সঙ্গে। তাদের মিলনেই জন্ম নিল মৃত্যু বা পরলোকের দেবতা আনুবিস। 

চেহারার দিক থেকে অবশ্য ওসাইরিসের তুলনায় সেথের সঙ্গেই 'শেয়াল দেবতা ' আনুবিসের মিল বেশি। যা হোক, স্ত্রীর পরকীয়া আর অবৈধ সন্তানজন্মের কথা যখন সেথের কানে গেল, রাগে দিকবিদিক জ্ঞান হারালেন তিনি। মনস্থির করলেন ওসাইরিসকে হত্যা করেই এর প্রতিশোধ নেবেন। মাঝেমধ্যে বিদেশভ্রমণের শখ ছিল ওসাইরিসের। বেড়াতে বেড়াতে চলে যেতেন সুদূর ভারতবর্ষের সীমা অব্দি। এমনই একবার, যখন রাজ্যভার রানি আইসিসের উপর দিয়ে রাজা বিদেশে বেড়াতে গেছেন, সেসময় গোপনসূত্রে রানি আইসিস জানতে পারলেন রাজাকে মারার জন্য নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে ভাই সেথ।

ছোটবেলায় একবার সেথকে লাথি মেরেছিলেন ওসাইরিস। সে অপমান ভোলেনি সেথ। তার উপর পৃথিবীর রাজা হওয়ার লোভ, তাকে পাগল করে তুলেছিল। আসলে ওসাইরিসের সৌভাগ্য আর ক্ষমতাকে শুরু থেকেই হিংসা করত সেথ। নানাভাবে চেষ্টা চালাত তার ক্ষতি করার। সেই ঈর্ষার আগুনে ঘি ফেলেছিল স্ত্রী নেপথিস ও ওসাইরিসের অবৈধ সম্পর্ক। ইথিওপিয়ার রানির সহায়তায় এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক তৈরি করলেন সেথ। এক মানুষ দীর্ঘ সেই সিন্দুকের গায়ে অসাধারণ কারুকাজ। খুব গোপনে ওই সিন্দুক তৈরি করা হয়েছিল ওসাইরিসের শরীরের মাপে। 

ওসাইরিস বিদেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরলে তার রাজত্বের ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এক বিরাট ভোজসভার আয়োজন করেন সেথ। ভাইকে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানান সেই মহাভোজে। আমন্ত্রণ করেন নিজের ৭২ জন বন্ধু ও অনুসারীকেও। ভোজসভা যখন জমে উঠেছে, হাতে হাতে ঘুরছে সুস্বাদু পানীয়ে ভরা পানপাত্র, তখনই বুদ্ধি করে সেথ সেই বিরাট কাঠের সিন্দুকটাকে নিয়ে আসেন ভোজসভায় , আর ঘোষণা করেন যার শরীরের মাপের সঙ্গে এই সিন্দুকের মাপ মিলে যাবে তাকেই উপহার দেয়া হবে এই মহার্ঘ সিন্দুক।

এত অপূর্ব কারুকাজ করা সিন্দুক কেউ আগে দেখেনি। সবাই একে একে গিয়ে সিন্দুকের ভেতর শুয়ে দেখতে লাগল। তবে কারো শরীরের মাপের সঙ্গেই মিলল না সিন্দুকের মাপ। মিলবে কী করে! এই সিন্দুক যে তৈরি হয়েছে ওসাইরিসের মাপে। একে একে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন সবাই। সবার শেষে এল ওসাইরিসের পালা।

ভাইয়ের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে কোনোরকম সন্দেহ না করেই ওসাইরিস গিয়ে শুয়ে পড়লেন প্রকাণ্ড সিন্দুকে। সিন্দুকে প্রবেশ করার পর রাজা ওসাইরিস দেখলেন তার শরীরের মাপের সঙ্গে সিন্দুকের মাপ একেবারে মিলে গেছে। তবে দুষ্টু সেথ বাইরে থেকে সেই সিন্দুক বন্ধ করে তার উপর ঢেলে দিলো গলানো সীসা। তারপর ওসাইরিসসহ সেই সিন্দুক নিক্ষেপ করা হল নীলনদের জলে। সিন্দুকের ভিতর ছটফট করতে করতে মারা গেলেন দেবতা ওসাইরিস। সিন্দকের ভেতরেই তার শরীর প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে রয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। 
আপন ভাইয়ের ষড়যন্ত্রে ৫ হাজার বছর ধরে সিন্দুকে বন্দি বড়ভাই
                       anrc
=====================
            <--©--●আদ্যনাথ ●--->
            【--anrc-23/04/2019--】
              【=রাত্রি :01:42:20=】
        【=তেঘড়িয়া=কোলকাতা -59=】


                                          ===========================

Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

626>||--দাদু ভাই--||

627>এক বর্ষার রাত::-