612>|| মায়ের দান ।।
612।। মায়ের দান ।।
<---------আদ্য নাথ -------->
আমি রোজ সকালে বিকেলে একটু পান খেতে কালিতলা মোড়ে যাই।
কদিন ধরে লক্ষ কিরছি একটি মেয়ে আন্দাজ করি ২৫--৩০ বৎসর বয়েস হবে, কথা বলতে পারেনা,
শরীর রুগ্ন, হাঁটতেও পারে না চারটি বিয়ারিং লাগিয়ে পিঁড়ির মতন বসবার জায়গা এমন এক গাড়ি হাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে চলে ,ভিক্ষা চায় না শুধু খাবার চায়। দেখে বেশ কষ্ট লাগলো। তাই ওকে আভা মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে পরোটা আর তরকারি খেতে দিলাম। খুব আনন্দ করে চারখানা পরোটা খেলো। তারপরে আর কিছুই খেতে চাইলোনা। রসগোল্লা সাধলাম ও নিলোনা ইশারায় দেখালো পেট ভোরে গেছে। ও আকাকে নমস্কার জানিয়ে ওই মেথর পট্টির দিগে চলে গেল। আমি পানের দোকানে আমার পান সাজাতে বলে জিজ্ঞাসা করলাম ,মেয়েটি ঐদিকে কোথায় গেল ? ওকি ওইদিগে থাকে ?
পান দোকান দাড় তপন বললো হ্যা হিন্দুস্থান মিলের ওই ভাঙা মেশিন ঘরটাতে কদিন ধরে থাকছে।
তবে কোথাথেকে এসেছে কেউ জানেনা , ও কিন্তু ভিক্ষা চায় না শুধু খাবার চায়। খাবার পেলেই ওই মেশিন ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকে।
দুপুরের দিগে বেরহয়ে কাগজ প্লাস্টিক কুড়ায়। কাগজ গুলি এই কাগজের দোকানে বদ্রীকে দিয়ে যায়
আর প্লাস্টিক গুলি ওই মিউনিসিপাল্টির গাড়িতে দিয়েদেয়। বদ্রী পয়সা দিতে চাইলেও কোন পয়সা নেয় না। এইতো কালকে বদ্রী অর্থাৎ কাগজ ওয়ালা দশ টাকা দিচ্ছিলো ,ও নেয় নি তবে খাবার দিতে ইশারা করছিলো। বদ্রীর বউ ওর জন্য রোজ খাবার পাঠায়। তবে একটু দেরি হয় ,তার মধ্যে অন্য কেউ কোন খাবার দিলে তাই খেয়ে নেয়। এই যেমন আজ আপনার দেওয়া পরোটা খেলো।
বদ্রীর বউ যে রুটি আনবে সেগুলি ও ঠিক দুপুরে খাবে।
এইটুকু শুনে আমি আমার পান নিয়ে চলে গেলাম।
তাপরে ধানবাদ চলে গেলাম ,তখন আমি সদ্য ধানবাদে ট্রান্সফার হয়ে এসেছি ,নাগপুর থেকে।
প্রতি মাসেই বাড়িতে আসি ,এবং কালীতলাতেও যাই পান খেতে। এমনিনকরে প্রায় বেশ কিছু দিন বাদে হঠাৎ ওই পান দোকান দাড় বললো মেয়েটি বোধ হয় বাঁচবে না। আমি জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে ওই বোবা খোঁড়া মেয়েটির ব্যাপারে বলছে। আমার মনেপড়ে গেল ওই মেয়েটিকে তাই জানতে ইচ্ছা হল। কিন্তু শুনলাম এক নারকীয় ঘটনা ,আজ থেকে প্রায় আট কি নয় মাস আগে কোন এক রাত্রে কিছু ছেলে মিলে ওই মেয়েটিকে জোর করে হাত পা বেঁধে শারীরিক অত্যাচার করেছে। সেদিন ঘটনায় মেয়েটি প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। সেই ব্যাপারে পুলিশ চার জন কে এরেস্ট করে ছিল ,পরে তারা অবশ্য প্রমানের এভাবে ছাড়া পেয়ে গেছে। তার পর থেকে মেয়েটি কেমন যেন হয়ে গেছে প্রায় পাগলের মতন ঘুরে বেড়ায় কেউ খাবার দিলেও ঠিক মতন খায় না।
আগে যেমন জামা কাপড়ের ব্যাপারে সাবথান ছিল ,সব সময় ঠিক ভাবে জামা পরে থাকতো, কিন্তু ওই ঘটনার পরে আজকাল সত্যি পাগল হয়ে গেছে। জামা কাপড়ে ঠিক থাকে না ,কোন দিন খালি গায়েই বেরিয়ে পরে। যে কেউ আবার ওর জামা কাপড় ঠিক ঠাক করে দেয়।
এই গত পরশু দিন হঠাৎ ও রাস্তার মাঝে শুয়ে পরে। সকলে ভাবলো হয়তো মরেই গেল। কিন্তু না ওই বদ্রী ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার ওকে হসপিটালে ভর্তি করতে বলে।
আমরা সকলে মিলে সাগরদত্ত হাসপাতালে ভর্তি করে আসলাম।
আজ সাগর দত্ত হাসপাতাল থেকে আর জি কর সাপাতালে রেফার করলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন কি হয়েছে যে সাগর দত্ত রেফার করলো আর জি করে ? সেকথা ওরা জানেনা।
বদ্রী যাচ্ছে ওকে আর জি করে নিয়ে যাবে। আমি বদ্রিকে বললাম চলো বদ্রী তোমার সাথে আমিও যাবো। বদ্রী বেশ খুশি হলো ,এখানে কারুর তো সময় নাই যে হাসপাতালে যাবে ,তবে আপনি গেলে পুরো ঘটনা জানতে পারবো।
সাগর দত্ত হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানলাম যে বেশ সমস্যা বেশ গম্ভীর।
মেয়েটি রক্তল্পতায় ভুগছে ,ওকে বাঁচাতে এখুনি কিছু ব্লাড দিতে হবে ,তারথেকে কঠিন ব্যাপার যে
মেয়েটি অন্তরসত্যা ,এবং বাচ্চাটির গলায় ওর মারের নারী জড়িয়ে আছে। যেকোন সময় বাচ্ছাটি
মারা যেতে পারে।
আমরা ডাক্তারের কথামতন মেয়েটিকে সাগর দত্ত হাসপাতাল থেকে নিয়ে অনেক কষ্টে আরজিকর হাসপাতালে ভর্তি করলাম। ডাক্তার বললেন এখুনি তিন চার বোতল "ও প্লাস" রক্ত চাই।
আমিজানি আমার রক্ত ও প্লাস কিন্তু আর রক্ত পাবো কোথায়। ভাগ্য ক্রমে বদ্রীর রাত ও ও প্লাস
ভালো মানুষের জন্য ঈশ্বর ঠিক ব্যবস্থা করে দেন। আই ও বদ্রী রক্ত দিয়ে বসে আছি এমনসময় কালী তোলা থেকে ছয় সাত জন এসেছে কি হল তা জানতে। ওরা যখন জানলো যে রক্ত চাই তখন ওদের মধ্যে তিন জন ছিল যাদের রক্ত ও প্লাস, ওরাও রক্ত দিলো। তাই রক্তের সমস্যা খুব ভালো ভাবে মিতে গেলে আমি কিছু জরুরি ওষুধ কিনে দিয়ে রাত্রি নয়টা নাগাদ বাড়ি ফিরলাম। শুধু সত্যেন নামে একটি ছেলে যে আভা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে কাজ করে ,সে রয়ে গেল ,যদি কোন দরকার হয়।
যাইহোক তার পরের দিন জানতে পারলাম অবস্থা অনেকটা নরমাল। এবং সেই রাত্রেই মেয়েটি একটি মেয়ে সন্তান প্রসব করলো। বেশ সুন্দর স্বাস্থ বান মেয়ে। একদিন পার হয়নি এখনি বেশ ছটফটে বাচ্চা। এবারে আমাদের চিন্তা বাড়লো ,এই মেয়ে টিকে নিয়ে কোথায় রাখবো। হিলের মেশিন ঘড়ে রাখলে ওই মা মেয়ে কেউই আর বাঁচবে না। বোবা খোঁড়া মেয়ে ,তার ওপরে আবার আজকাল পাগলামি শুরু করেছে। সেই কারনে বেশ চিন্তার কারণ। হঠাৎ খবর পেলাম বাচ্ছাটির জন্ডিস হয়েছে তাই ট্রিটমেন্ট চলছে। নানান চিন্তায় কোন কুল কিনারা না করতে পরে বেশ চিন্তায় আছি সকলে।
হসপিটালের পাশের দোকানে ঘুগনি রুটি খাচ্ছি। ঠিক এমন সময় দাস বাবু আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং এতো সকালে এখানে আসার কারন জানতে চাইলেন।
দাস বাবু মানিকতলায় যার লোহার ব্যবসা ও একটি স্টেশনারী দোকান ও আছে। ওনার ছেলে শ্যামল আমার সাথে বি কে সি কলেজে বি এস সি পড়েছে ,তখন থেকেই এই দাস বাবুর সাথে আমার পরিচয় বন্ধুর বাবা হিসাবে। এবং উনি আমার কাজ কর্মের অনেকটাই জানেন। আমি যে টেক্সি ,বাস চালিয়ে পড়াশুনা করেছি তাও উনি জানতেন ,এবং আমার কিছু সমাজ সেবার কাজের ব্যাপারেও উনি যেতেন। সমাজ কল্যানে নানান সময়ে নানান সমস্যায় সাহায্যের জন্য আমি ওনার কাছথেকে কোন দিন খালি হাতে ফিরিনি। সে যাই হোক উনি আমাদের সকল সমস্যা শুনলেন। ওহ বলতে ভুলে গেছি যে এই আরজিকর হাসপাতালে ওনার বেশ পরিচয় আছে।
আমাদের সকল কথা শুনে উনি বললেন তোমাদের কোন চিন্তা করতে হবেনা। এমন এক অসহায়ের সাহায্য করতে পারলে নিজের ভালো লাগবে ,আর তাই এই মেয়েটি ছাড়া পেলে ওকে আমি আমার বাড়ি নিয়ে যাবো। তেমন অসুবিধা না করলে ওরা আমার বাড়িতেই থাকতে পারবে ,আর যদি কোন গোলমাল করে বা মেয়েটি যদি সত্যি বেশি পাগলামি করে তবে ওদের কোন হোম রাখার ব্যবস্থা করে দেব। তাই তোমরা কোন চিন্তা করো না।
সত্যি এবারে ঠিক বুজতে পেরেছি ঈশ্বর এই নাচার মেয়েটির সহায়।
সকালে ভিজিটিং আওয়ারে আমরা মেয়েটিকে দেখতে গেলে আমাদের অবাক করে মেয়েটি দুই হাত জুড়ে আমাদের নমস্কার করলো এবং মেয়েটি কানতে শুরু করলো।
আমরা নানান ভাবে ওকে শান্তনা দিলাম যে ওর থাকার জন্য ভালো জায়গা পাওয়া গেছে ,কোন চিন্তার কারণ নাই। এর মধ্যে বাচ্ছাটি কানতে শুরু করলে ,ও বাচ্ছাটিকে বুকের দুধ খাওয়ালো।
এবং আমরা অবাক হয়ে দেখলাম যে ওর মধ্যে পাগলামির চিনি ছিটে ফোটাও নাই ,সম্পূর্ণ সুস্থ মারের মতন বাচ্ছাটির যত্ন করছে। এমন দেখে বেশ ভালো লাগলো।
ডাক্তার বললেন দেখুন ওর ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে তার বীভৎস চিন্তায় ওর খানিকটা ব্রেইন ডিস্টার্ব হয়ে ছিল কিন্তু বাচ্ছাটি জন্মের আনন্দে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
সব ঠিক থাকলে আগামী কালকে ও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে।
এর পরের ঘটনা একটু সংক্ষেপে বলি
দাস বাবু মেয়েটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবার পরে একদিন আমি আর বদ্রী দাসবাবুর বাড়িতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম যে দাস বাবুর স্ত্রী মেয়েটির নাম রেখেছেন পূর্ণিমা আর বাচ্ছাটির নাম রেখেছেন লক্ষ্মী। সত্যি মেয়েটিকে আজ দেখে এতো সুন্দর লাগছে যে মনে মনে ভাবলাম সার্থক ওর পূর্ণিমা নাম ,আর বাচ্ছাটি অপূর্ব সুন্দর ফুট ফুটে একটি বিদেশী পুতুলের মতন।
জালাম যে পূর্ণিমা স্বেচ্ছায় দাস বাবুর বাড়ির সকল কাজ করে হাটতে না পারলেও লেছড়ে লেছড়ে সকল কাজ করে এবং দাস বাবুর স্ত্রীর ও খুব যত্ন করেনে হলো ও যেন দাস বাবুর মেয়ের মতন হয়ে গেছে। দাসবাবুর স্ত্রী বাচ্ছাটিকে সারাদিন নিজের কাছেই রাখেন।
বেশ চলছিল ভালো। বেশ কিছুদিন পরে ,প্রায় চার বৎসর পরে এক দিন জানতে পারলেন যে দাস বাবুর ছেলে শ্যামল ভীষণ অসুস্থ। ওর দুটি কিডনি ই একেবারে খারাপ হয়ে গেছে।
দাসবাবু চেষ্টা করে চলেছেন যে কোন ভাবে একটি কিডনি জোগাড় করতে। কিন্তু না কোনভাবেই কোন সফলতা না পেয়ে বেশ ভেঙে পড়েছেন। একটি মাত্র ছেলে ,তও হারাতে বসেছেন।
আমি খবর পেয়ে দেখা করতে গেলাম দাস বাবুর বাড়িতে ,তখন দাস বাবু বাড়িতেই ছিলেন।
আমি পৌঁছতেই পূর্ণিমা এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে কিছু বলতে চাইছে। আমি ওর পশে বসে পড়লাম ব্যাপার টা জানতে যে ও কি বলতে চায়।
শেষে বুঝতে পারলাম যে পূর্ণিমার ইচ্ছা যে ও শ্যামল কে একটি কিডনি দিতে চায়।
এবং সেইমতন আমি যেন দাস বাবুকে বুঝিয়ে রাজি করাই।
ও আগেই দাস বাবুকে এই প্রস্তাব দিয়েছে ,কিন্তু দাস বাবু কোন মোতেই এই প্রস্তাবে রাজি হননি।
আমি একটু ঘুরিয়ে ব্যাপার টা মর্তবা জন্য দাস বাবুর স্ত্রীকে বোঝালাম।
দেখুন আপনারা ওদের সকল ভার বছেন এবং বাচ্ছাটিও এখানে সুখে আছে ,এমত অবস্থায় পূর্ণিমা যদি এমন মহান দেন দেয় তো ক্ষতি কি। বরঞ্চ শ্যামল যে পূর্ণিমাকে একদম পছন্দ করেনা তার পরেও পূর্ণিমার কিডনি শ্যামের যদি ম্যাচ করে যায় এবং তাতে শ্যামল ভালো হয়ে গেলে দেখবেন শ্যামলের মনের ও পরিবর্তন হবে।
যাই হোক অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে দাস বাবুকে রাজি করলাম। তাতে পূর্ণিমাও বেশ খুশি হল।
অদ্ভুত ব্যাপার যে পূর্ণিমার কিডনি শ্যামলের ভীষণ ভালো ভাবে ম্যাচ করে গেছে।
বিড়লা হসপিটালে পাশা পাশি বেড়ে শুয়ে শ্যামল ও পূর্ণিমা। শ্যামল এখন অনেকটাই নরমাল
তবুও মাঝে মধ্যে ব্লাড ট্রান্সমিট করতে এবং পূর্ণিমাকে সুস্থ করে তুলতে ডাক্তার রা ভীষণ ব্যস্ত।
তবে ভয়ের কোন কারন নাই সকল বিপদ কেটে গেছে। এখন দুজনেই অনেকটা সুস্থ।
তারপরেও প্রায় সাতদিন পরে ওরা বাড়ি ফিরলো।
এখন দুজনেই সম্পূর্ণ সুস্থ।
তাপরে বেশ কয়েক দিন পরে এক রবিবার আমি আর বদ্রী মানিকতলা গেলাম দাস বাবুর বাড়িতে।
সেখানে আজ খুশির মহল।
আমরা পৌঁছতেই পূর্ণিমা তাড়াতাড়ি এসে আমাকে ও বদ্রীকে প্রণাম করলো।
আর ঠিক তখনি শ্যামল বাড়িতে এলো। আমি বললাম কিরে কেমন আছিস ?
শ্যামল বললো তোরা আজকে আমাদের বাড়িতে রাত্রের খাবার খেয়ে তবে জাবি। অনেক কথা আছে তোর সাথে। কি আর করি শ্যামল যা গোয়ার গোবিন্দ ওর কথামতোন রাত্রের খাবার না খেয়ে গেলে যদি কোন অনর্থক কিছু ঘটায় ,সেই ভয়ে আমরা শ্যামলের কোথায় রাজি হয়ে বসে বাচ্ছাটিকে কোলে নিয়ে আজ করছি। রাত্রি সাত টা নাগাদ দাস বাবু বাড়িতে আসলেন।
সকলে মাইল একসাথে রাতের খাবার খেলাম। পূর্ণিমা দেখি ভীষণ খুশি।
রাতের খাবারের পরে আমি বললাম এবার আমরা চলি। বেশি রাট হলে বাস পেতে মুশকিল হবে।
শ্যামল বললো আমি ড্রাইভারকে বলে রেখেছি ,তোদের বাড়িতে পৌঁছে দেবে। কোন চিন্তা করিস না।
হঠাৎ শ্যামল বলতে শুরু করলো দেখ আমি পূর্ণিমার কাছে চির ঋণী। তুই একটু পূর্ণিমাকে বল ও যেন আমায় ক্ষমা করে। ও আমাকে ক্ষমা না করলে আমি বেঁচেও মরার মতন আছি।
পূর্ণিমা কাছেই ছিল ,তাই সব শুনা কাঁদতে কাঁদতে লেছড়াতে লেছড়াতে এসে শ্যামলের দুই পা জড়িয়ে ধরে ওর পায়ে মাথা রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। শ্যামল তারাতারি পূর্ণিমাকে ধরে বসাতে চেষ্টা করলো ,কিন্তু পূর্ণিমা কিছুতেই শ্যামলের পা ছাড়তে রাজিনই। ওজে কি বলতে চাইছে সেটাও বুঝতে পারছিলাম না।
বদ্রী এতক্ষন চুপ থেকে বলতে লাগলো ( আগে বলতে ভুলে গেছিলাম যে এই বদ্রী পূর্ণিমার কথা ঠিক বুঝতে পারে ) দেখুন পূর্ণিমা বলতে চাইছে যে শ্যামল বাবুর কোন আচরণেই ও দুঃখিত নয় কারন ওনার না আশ্রয় না দিলে পূর্ণিমা ও তার মেয়ে বাঁচতে পারতোনা। তাই শ্যামল বাবু কি বলেছে তা নিয়ে পূর্ণিমার কোন দুঃখ নাই। ঈশ্বরের অনেক কৃপা ওর কিডনি যে শ্যামল বাবুর জীবন বাঁচাতে সহায় হয়েছে এতে পূর্ণিমা ভীষণ খুশি।
দাসবাবু বললেন দেখো এক মা নিজের অঙ্গ দিয়ে আর এক মায়ের সন্তানের বাঁচিয়ে তুললো।
এটিই বোধহয় আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ পুণ্যের ফল।
আমি সেদিন এই মা সন্তানকে আশ্রয় না দিলে, আজ আমিও আমর এক মাত্র সন্তান হারাতাম।
আর শ্যামল যে পূর্ণিমাকে আজ চিন্তে পেরেছে এবং নিজের আচরণের জন্য আজ ও দুঃখিত এটাও ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয়েছে। পূর্ণিমা আজ আমার ঘড়ের সকল অন্ধকার দূরকরে নূতন আলো জ্বেলেছে।
দাসবাবুর স্ত্রী বললেন পূর্ণিমা আমার নিজের মেয়ের থেকেও বেশি আদরের, ওকে আমি পেতে ধরিনি
তবুও ও আমার আদরের সন্তান আর ওর এই ছোট্ট সুন্দর মেয়ে তো নয় ছোট্ট পড়িটি আমাকে নুতন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।
শ্যামল পূর্ণিমার হাত ধরে বললো এতদিন না বুঝে তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি ,কিন্তু আজ থেকে তুমি আমার ছোট বোন। আজ আমি তোমাকে কিছু উপহার দিতে চাই। বোলো তোমার কি চাই ,তুমি যা চাইবে আমি সেটাই তোমাকে আজ দিয়ে নিজের মনের সকল গ্লানি দূর করতে চাই।
এবার পূর্ণিমা বললো সত্যি যদি আপনি আমাকে নিজের বোন মানেন ও আমি যা চাই আপনি সেটাই আমাকে দেবেন তবে আজ আমি একটাই জিনিস চাইবো ,যদি সেটা আপনি আমাকে দিতে পারেন তবেই আমি খুশি হবো এবং জানবো যে সত্যি আপনি আমার একমাত্র দাদা।
শ্যামল বললো চাও তোমায় যা ইচ্ছা তুমি চাইতে পার ,আমি সকলের সামনে কথা দিচ্ছি যে তোমার ইচ্ছা আজ আমি পূর্ন করবোই তা সে যতই মূল্যবান হোক না কেন।
পূর্ণিমা বললো ঠিক আছে আপনি আমার মাথায় হাত রেখে বলুন যে আজ থেকে আপনি আর কোন দিন ওই সকল ছাই ভস্ব আর মদ খাবেননা। আর এইটুকুই আমার চাওয়া।
উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে পূর্ণিমাকে দেখতে লাগলো। শ্যামলের চোখে জল ,শ্যামল কাঁদতে কাঁদতে বললো আজ পর্যন্ত কেউ কখনো আমাকে এমন করে মদ খেতে বারণ করেনি। আমি জানি আমার এতদিনের বদ অভ্যাস ছাড়তে কষ্ট হবে ,তবুও আজ আমি কথা দিচ্ছি আর কোনদিন আমি কোন নেশা করবোনা।
শ্যামলের মা চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে পূর্ণিমাকে জড়িয়ে ধরে যত আদর করে ,ততই ওনার চোখ থেকে জল পূর্ণিমার চুল ভিজিয়ে দেয়।
আমি বললাম সত্যি মেয়েরা মা এর জাত মা ছাড়া কেউ পারেনা এমন দান দিতে। একমা দিয়েছেন জীবন ,আর এক বোন (সেও মায়েরই এক রূপ )দিলো নিজের অঙ্গ। আজ দুই মায়ের দনে শ্যামল ফিরে পেল তার জীবন। তার উপরে আজ শ্যামলের হল জীবনের অভিষেক।
হৃদয় উজাড় করে না দিলে হয় কি এমন অভিষেক।
এক মায়ের দানে সৃষ্টি সন্তানের জীবন, আরএক মা দিলেন পুনর্জীবন।
মা ছাড়া কে পারে দিতে এমন দান, যে দানে পূর্ণ হয় সন্তানের জীবন।
<---------আদ্য নাথ -------->
আমি রোজ সকালে বিকেলে একটু পান খেতে কালিতলা মোড়ে যাই।
কদিন ধরে লক্ষ কিরছি একটি মেয়ে আন্দাজ করি ২৫--৩০ বৎসর বয়েস হবে, কথা বলতে পারেনা,
শরীর রুগ্ন, হাঁটতেও পারে না চারটি বিয়ারিং লাগিয়ে পিঁড়ির মতন বসবার জায়গা এমন এক গাড়ি হাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে চলে ,ভিক্ষা চায় না শুধু খাবার চায়। দেখে বেশ কষ্ট লাগলো। তাই ওকে আভা মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে পরোটা আর তরকারি খেতে দিলাম। খুব আনন্দ করে চারখানা পরোটা খেলো। তারপরে আর কিছুই খেতে চাইলোনা। রসগোল্লা সাধলাম ও নিলোনা ইশারায় দেখালো পেট ভোরে গেছে। ও আকাকে নমস্কার জানিয়ে ওই মেথর পট্টির দিগে চলে গেল। আমি পানের দোকানে আমার পান সাজাতে বলে জিজ্ঞাসা করলাম ,মেয়েটি ঐদিকে কোথায় গেল ? ওকি ওইদিগে থাকে ?
পান দোকান দাড় তপন বললো হ্যা হিন্দুস্থান মিলের ওই ভাঙা মেশিন ঘরটাতে কদিন ধরে থাকছে।
তবে কোথাথেকে এসেছে কেউ জানেনা , ও কিন্তু ভিক্ষা চায় না শুধু খাবার চায়। খাবার পেলেই ওই মেশিন ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকে।
দুপুরের দিগে বেরহয়ে কাগজ প্লাস্টিক কুড়ায়। কাগজ গুলি এই কাগজের দোকানে বদ্রীকে দিয়ে যায়
আর প্লাস্টিক গুলি ওই মিউনিসিপাল্টির গাড়িতে দিয়েদেয়। বদ্রী পয়সা দিতে চাইলেও কোন পয়সা নেয় না। এইতো কালকে বদ্রী অর্থাৎ কাগজ ওয়ালা দশ টাকা দিচ্ছিলো ,ও নেয় নি তবে খাবার দিতে ইশারা করছিলো। বদ্রীর বউ ওর জন্য রোজ খাবার পাঠায়। তবে একটু দেরি হয় ,তার মধ্যে অন্য কেউ কোন খাবার দিলে তাই খেয়ে নেয়। এই যেমন আজ আপনার দেওয়া পরোটা খেলো।
বদ্রীর বউ যে রুটি আনবে সেগুলি ও ঠিক দুপুরে খাবে।
এইটুকু শুনে আমি আমার পান নিয়ে চলে গেলাম।
তাপরে ধানবাদ চলে গেলাম ,তখন আমি সদ্য ধানবাদে ট্রান্সফার হয়ে এসেছি ,নাগপুর থেকে।
প্রতি মাসেই বাড়িতে আসি ,এবং কালীতলাতেও যাই পান খেতে। এমনিনকরে প্রায় বেশ কিছু দিন বাদে হঠাৎ ওই পান দোকান দাড় বললো মেয়েটি বোধ হয় বাঁচবে না। আমি জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে ওই বোবা খোঁড়া মেয়েটির ব্যাপারে বলছে। আমার মনেপড়ে গেল ওই মেয়েটিকে তাই জানতে ইচ্ছা হল। কিন্তু শুনলাম এক নারকীয় ঘটনা ,আজ থেকে প্রায় আট কি নয় মাস আগে কোন এক রাত্রে কিছু ছেলে মিলে ওই মেয়েটিকে জোর করে হাত পা বেঁধে শারীরিক অত্যাচার করেছে। সেদিন ঘটনায় মেয়েটি প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। সেই ব্যাপারে পুলিশ চার জন কে এরেস্ট করে ছিল ,পরে তারা অবশ্য প্রমানের এভাবে ছাড়া পেয়ে গেছে। তার পর থেকে মেয়েটি কেমন যেন হয়ে গেছে প্রায় পাগলের মতন ঘুরে বেড়ায় কেউ খাবার দিলেও ঠিক মতন খায় না।
আগে যেমন জামা কাপড়ের ব্যাপারে সাবথান ছিল ,সব সময় ঠিক ভাবে জামা পরে থাকতো, কিন্তু ওই ঘটনার পরে আজকাল সত্যি পাগল হয়ে গেছে। জামা কাপড়ে ঠিক থাকে না ,কোন দিন খালি গায়েই বেরিয়ে পরে। যে কেউ আবার ওর জামা কাপড় ঠিক ঠাক করে দেয়।
এই গত পরশু দিন হঠাৎ ও রাস্তার মাঝে শুয়ে পরে। সকলে ভাবলো হয়তো মরেই গেল। কিন্তু না ওই বদ্রী ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার ওকে হসপিটালে ভর্তি করতে বলে।
আমরা সকলে মিলে সাগরদত্ত হাসপাতালে ভর্তি করে আসলাম।
আজ সাগর দত্ত হাসপাতাল থেকে আর জি কর সাপাতালে রেফার করলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন কি হয়েছে যে সাগর দত্ত রেফার করলো আর জি করে ? সেকথা ওরা জানেনা।
বদ্রী যাচ্ছে ওকে আর জি করে নিয়ে যাবে। আমি বদ্রিকে বললাম চলো বদ্রী তোমার সাথে আমিও যাবো। বদ্রী বেশ খুশি হলো ,এখানে কারুর তো সময় নাই যে হাসপাতালে যাবে ,তবে আপনি গেলে পুরো ঘটনা জানতে পারবো।
সাগর দত্ত হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানলাম যে বেশ সমস্যা বেশ গম্ভীর।
মেয়েটি রক্তল্পতায় ভুগছে ,ওকে বাঁচাতে এখুনি কিছু ব্লাড দিতে হবে ,তারথেকে কঠিন ব্যাপার যে
মেয়েটি অন্তরসত্যা ,এবং বাচ্চাটির গলায় ওর মারের নারী জড়িয়ে আছে। যেকোন সময় বাচ্ছাটি
মারা যেতে পারে।
আমরা ডাক্তারের কথামতন মেয়েটিকে সাগর দত্ত হাসপাতাল থেকে নিয়ে অনেক কষ্টে আরজিকর হাসপাতালে ভর্তি করলাম। ডাক্তার বললেন এখুনি তিন চার বোতল "ও প্লাস" রক্ত চাই।
আমিজানি আমার রক্ত ও প্লাস কিন্তু আর রক্ত পাবো কোথায়। ভাগ্য ক্রমে বদ্রীর রাত ও ও প্লাস
ভালো মানুষের জন্য ঈশ্বর ঠিক ব্যবস্থা করে দেন। আই ও বদ্রী রক্ত দিয়ে বসে আছি এমনসময় কালী তোলা থেকে ছয় সাত জন এসেছে কি হল তা জানতে। ওরা যখন জানলো যে রক্ত চাই তখন ওদের মধ্যে তিন জন ছিল যাদের রক্ত ও প্লাস, ওরাও রক্ত দিলো। তাই রক্তের সমস্যা খুব ভালো ভাবে মিতে গেলে আমি কিছু জরুরি ওষুধ কিনে দিয়ে রাত্রি নয়টা নাগাদ বাড়ি ফিরলাম। শুধু সত্যেন নামে একটি ছেলে যে আভা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে কাজ করে ,সে রয়ে গেল ,যদি কোন দরকার হয়।
যাইহোক তার পরের দিন জানতে পারলাম অবস্থা অনেকটা নরমাল। এবং সেই রাত্রেই মেয়েটি একটি মেয়ে সন্তান প্রসব করলো। বেশ সুন্দর স্বাস্থ বান মেয়ে। একদিন পার হয়নি এখনি বেশ ছটফটে বাচ্চা। এবারে আমাদের চিন্তা বাড়লো ,এই মেয়ে টিকে নিয়ে কোথায় রাখবো। হিলের মেশিন ঘড়ে রাখলে ওই মা মেয়ে কেউই আর বাঁচবে না। বোবা খোঁড়া মেয়ে ,তার ওপরে আবার আজকাল পাগলামি শুরু করেছে। সেই কারনে বেশ চিন্তার কারণ। হঠাৎ খবর পেলাম বাচ্ছাটির জন্ডিস হয়েছে তাই ট্রিটমেন্ট চলছে। নানান চিন্তায় কোন কুল কিনারা না করতে পরে বেশ চিন্তায় আছি সকলে।
হসপিটালের পাশের দোকানে ঘুগনি রুটি খাচ্ছি। ঠিক এমন সময় দাস বাবু আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং এতো সকালে এখানে আসার কারন জানতে চাইলেন।
দাস বাবু মানিকতলায় যার লোহার ব্যবসা ও একটি স্টেশনারী দোকান ও আছে। ওনার ছেলে শ্যামল আমার সাথে বি কে সি কলেজে বি এস সি পড়েছে ,তখন থেকেই এই দাস বাবুর সাথে আমার পরিচয় বন্ধুর বাবা হিসাবে। এবং উনি আমার কাজ কর্মের অনেকটাই জানেন। আমি যে টেক্সি ,বাস চালিয়ে পড়াশুনা করেছি তাও উনি জানতেন ,এবং আমার কিছু সমাজ সেবার কাজের ব্যাপারেও উনি যেতেন। সমাজ কল্যানে নানান সময়ে নানান সমস্যায় সাহায্যের জন্য আমি ওনার কাছথেকে কোন দিন খালি হাতে ফিরিনি। সে যাই হোক উনি আমাদের সকল সমস্যা শুনলেন। ওহ বলতে ভুলে গেছি যে এই আরজিকর হাসপাতালে ওনার বেশ পরিচয় আছে।
আমাদের সকল কথা শুনে উনি বললেন তোমাদের কোন চিন্তা করতে হবেনা। এমন এক অসহায়ের সাহায্য করতে পারলে নিজের ভালো লাগবে ,আর তাই এই মেয়েটি ছাড়া পেলে ওকে আমি আমার বাড়ি নিয়ে যাবো। তেমন অসুবিধা না করলে ওরা আমার বাড়িতেই থাকতে পারবে ,আর যদি কোন গোলমাল করে বা মেয়েটি যদি সত্যি বেশি পাগলামি করে তবে ওদের কোন হোম রাখার ব্যবস্থা করে দেব। তাই তোমরা কোন চিন্তা করো না।
সত্যি এবারে ঠিক বুজতে পেরেছি ঈশ্বর এই নাচার মেয়েটির সহায়।
সকালে ভিজিটিং আওয়ারে আমরা মেয়েটিকে দেখতে গেলে আমাদের অবাক করে মেয়েটি দুই হাত জুড়ে আমাদের নমস্কার করলো এবং মেয়েটি কানতে শুরু করলো।
আমরা নানান ভাবে ওকে শান্তনা দিলাম যে ওর থাকার জন্য ভালো জায়গা পাওয়া গেছে ,কোন চিন্তার কারণ নাই। এর মধ্যে বাচ্ছাটি কানতে শুরু করলে ,ও বাচ্ছাটিকে বুকের দুধ খাওয়ালো।
এবং আমরা অবাক হয়ে দেখলাম যে ওর মধ্যে পাগলামির চিনি ছিটে ফোটাও নাই ,সম্পূর্ণ সুস্থ মারের মতন বাচ্ছাটির যত্ন করছে। এমন দেখে বেশ ভালো লাগলো।
ডাক্তার বললেন দেখুন ওর ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে তার বীভৎস চিন্তায় ওর খানিকটা ব্রেইন ডিস্টার্ব হয়ে ছিল কিন্তু বাচ্ছাটি জন্মের আনন্দে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
সব ঠিক থাকলে আগামী কালকে ও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে।
এর পরের ঘটনা একটু সংক্ষেপে বলি
দাস বাবু মেয়েটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবার পরে একদিন আমি আর বদ্রী দাসবাবুর বাড়িতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম যে দাস বাবুর স্ত্রী মেয়েটির নাম রেখেছেন পূর্ণিমা আর বাচ্ছাটির নাম রেখেছেন লক্ষ্মী। সত্যি মেয়েটিকে আজ দেখে এতো সুন্দর লাগছে যে মনে মনে ভাবলাম সার্থক ওর পূর্ণিমা নাম ,আর বাচ্ছাটি অপূর্ব সুন্দর ফুট ফুটে একটি বিদেশী পুতুলের মতন।
জালাম যে পূর্ণিমা স্বেচ্ছায় দাস বাবুর বাড়ির সকল কাজ করে হাটতে না পারলেও লেছড়ে লেছড়ে সকল কাজ করে এবং দাস বাবুর স্ত্রীর ও খুব যত্ন করেনে হলো ও যেন দাস বাবুর মেয়ের মতন হয়ে গেছে। দাসবাবুর স্ত্রী বাচ্ছাটিকে সারাদিন নিজের কাছেই রাখেন।
বেশ চলছিল ভালো। বেশ কিছুদিন পরে ,প্রায় চার বৎসর পরে এক দিন জানতে পারলেন যে দাস বাবুর ছেলে শ্যামল ভীষণ অসুস্থ। ওর দুটি কিডনি ই একেবারে খারাপ হয়ে গেছে।
দাসবাবু চেষ্টা করে চলেছেন যে কোন ভাবে একটি কিডনি জোগাড় করতে। কিন্তু না কোনভাবেই কোন সফলতা না পেয়ে বেশ ভেঙে পড়েছেন। একটি মাত্র ছেলে ,তও হারাতে বসেছেন।
আমি খবর পেয়ে দেখা করতে গেলাম দাস বাবুর বাড়িতে ,তখন দাস বাবু বাড়িতেই ছিলেন।
আমি পৌঁছতেই পূর্ণিমা এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে কিছু বলতে চাইছে। আমি ওর পশে বসে পড়লাম ব্যাপার টা জানতে যে ও কি বলতে চায়।
শেষে বুঝতে পারলাম যে পূর্ণিমার ইচ্ছা যে ও শ্যামল কে একটি কিডনি দিতে চায়।
এবং সেইমতন আমি যেন দাস বাবুকে বুঝিয়ে রাজি করাই।
ও আগেই দাস বাবুকে এই প্রস্তাব দিয়েছে ,কিন্তু দাস বাবু কোন মোতেই এই প্রস্তাবে রাজি হননি।
আমি একটু ঘুরিয়ে ব্যাপার টা মর্তবা জন্য দাস বাবুর স্ত্রীকে বোঝালাম।
দেখুন আপনারা ওদের সকল ভার বছেন এবং বাচ্ছাটিও এখানে সুখে আছে ,এমত অবস্থায় পূর্ণিমা যদি এমন মহান দেন দেয় তো ক্ষতি কি। বরঞ্চ শ্যামল যে পূর্ণিমাকে একদম পছন্দ করেনা তার পরেও পূর্ণিমার কিডনি শ্যামের যদি ম্যাচ করে যায় এবং তাতে শ্যামল ভালো হয়ে গেলে দেখবেন শ্যামলের মনের ও পরিবর্তন হবে।
যাই হোক অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে দাস বাবুকে রাজি করলাম। তাতে পূর্ণিমাও বেশ খুশি হল।
অদ্ভুত ব্যাপার যে পূর্ণিমার কিডনি শ্যামলের ভীষণ ভালো ভাবে ম্যাচ করে গেছে।
বিড়লা হসপিটালে পাশা পাশি বেড়ে শুয়ে শ্যামল ও পূর্ণিমা। শ্যামল এখন অনেকটাই নরমাল
তবুও মাঝে মধ্যে ব্লাড ট্রান্সমিট করতে এবং পূর্ণিমাকে সুস্থ করে তুলতে ডাক্তার রা ভীষণ ব্যস্ত।
তবে ভয়ের কোন কারন নাই সকল বিপদ কেটে গেছে। এখন দুজনেই অনেকটা সুস্থ।
তারপরেও প্রায় সাতদিন পরে ওরা বাড়ি ফিরলো।
এখন দুজনেই সম্পূর্ণ সুস্থ।
তাপরে বেশ কয়েক দিন পরে এক রবিবার আমি আর বদ্রী মানিকতলা গেলাম দাস বাবুর বাড়িতে।
সেখানে আজ খুশির মহল।
আমরা পৌঁছতেই পূর্ণিমা তাড়াতাড়ি এসে আমাকে ও বদ্রীকে প্রণাম করলো।
আর ঠিক তখনি শ্যামল বাড়িতে এলো। আমি বললাম কিরে কেমন আছিস ?
শ্যামল বললো তোরা আজকে আমাদের বাড়িতে রাত্রের খাবার খেয়ে তবে জাবি। অনেক কথা আছে তোর সাথে। কি আর করি শ্যামল যা গোয়ার গোবিন্দ ওর কথামতোন রাত্রের খাবার না খেয়ে গেলে যদি কোন অনর্থক কিছু ঘটায় ,সেই ভয়ে আমরা শ্যামলের কোথায় রাজি হয়ে বসে বাচ্ছাটিকে কোলে নিয়ে আজ করছি। রাত্রি সাত টা নাগাদ দাস বাবু বাড়িতে আসলেন।
সকলে মাইল একসাথে রাতের খাবার খেলাম। পূর্ণিমা দেখি ভীষণ খুশি।
রাতের খাবারের পরে আমি বললাম এবার আমরা চলি। বেশি রাট হলে বাস পেতে মুশকিল হবে।
শ্যামল বললো আমি ড্রাইভারকে বলে রেখেছি ,তোদের বাড়িতে পৌঁছে দেবে। কোন চিন্তা করিস না।
হঠাৎ শ্যামল বলতে শুরু করলো দেখ আমি পূর্ণিমার কাছে চির ঋণী। তুই একটু পূর্ণিমাকে বল ও যেন আমায় ক্ষমা করে। ও আমাকে ক্ষমা না করলে আমি বেঁচেও মরার মতন আছি।
পূর্ণিমা কাছেই ছিল ,তাই সব শুনা কাঁদতে কাঁদতে লেছড়াতে লেছড়াতে এসে শ্যামলের দুই পা জড়িয়ে ধরে ওর পায়ে মাথা রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। শ্যামল তারাতারি পূর্ণিমাকে ধরে বসাতে চেষ্টা করলো ,কিন্তু পূর্ণিমা কিছুতেই শ্যামলের পা ছাড়তে রাজিনই। ওজে কি বলতে চাইছে সেটাও বুঝতে পারছিলাম না।
বদ্রী এতক্ষন চুপ থেকে বলতে লাগলো ( আগে বলতে ভুলে গেছিলাম যে এই বদ্রী পূর্ণিমার কথা ঠিক বুঝতে পারে ) দেখুন পূর্ণিমা বলতে চাইছে যে শ্যামল বাবুর কোন আচরণেই ও দুঃখিত নয় কারন ওনার না আশ্রয় না দিলে পূর্ণিমা ও তার মেয়ে বাঁচতে পারতোনা। তাই শ্যামল বাবু কি বলেছে তা নিয়ে পূর্ণিমার কোন দুঃখ নাই। ঈশ্বরের অনেক কৃপা ওর কিডনি যে শ্যামল বাবুর জীবন বাঁচাতে সহায় হয়েছে এতে পূর্ণিমা ভীষণ খুশি।
দাসবাবু বললেন দেখো এক মা নিজের অঙ্গ দিয়ে আর এক মায়ের সন্তানের বাঁচিয়ে তুললো।
এটিই বোধহয় আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ পুণ্যের ফল।
আমি সেদিন এই মা সন্তানকে আশ্রয় না দিলে, আজ আমিও আমর এক মাত্র সন্তান হারাতাম।
আর শ্যামল যে পূর্ণিমাকে আজ চিন্তে পেরেছে এবং নিজের আচরণের জন্য আজ ও দুঃখিত এটাও ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয়েছে। পূর্ণিমা আজ আমার ঘড়ের সকল অন্ধকার দূরকরে নূতন আলো জ্বেলেছে।
দাসবাবুর স্ত্রী বললেন পূর্ণিমা আমার নিজের মেয়ের থেকেও বেশি আদরের, ওকে আমি পেতে ধরিনি
তবুও ও আমার আদরের সন্তান আর ওর এই ছোট্ট সুন্দর মেয়ে তো নয় ছোট্ট পড়িটি আমাকে নুতন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।
শ্যামল পূর্ণিমার হাত ধরে বললো এতদিন না বুঝে তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি ,কিন্তু আজ থেকে তুমি আমার ছোট বোন। আজ আমি তোমাকে কিছু উপহার দিতে চাই। বোলো তোমার কি চাই ,তুমি যা চাইবে আমি সেটাই তোমাকে আজ দিয়ে নিজের মনের সকল গ্লানি দূর করতে চাই।
এবার পূর্ণিমা বললো সত্যি যদি আপনি আমাকে নিজের বোন মানেন ও আমি যা চাই আপনি সেটাই আমাকে দেবেন তবে আজ আমি একটাই জিনিস চাইবো ,যদি সেটা আপনি আমাকে দিতে পারেন তবেই আমি খুশি হবো এবং জানবো যে সত্যি আপনি আমার একমাত্র দাদা।
শ্যামল বললো চাও তোমায় যা ইচ্ছা তুমি চাইতে পার ,আমি সকলের সামনে কথা দিচ্ছি যে তোমার ইচ্ছা আজ আমি পূর্ন করবোই তা সে যতই মূল্যবান হোক না কেন।
পূর্ণিমা বললো ঠিক আছে আপনি আমার মাথায় হাত রেখে বলুন যে আজ থেকে আপনি আর কোন দিন ওই সকল ছাই ভস্ব আর মদ খাবেননা। আর এইটুকুই আমার চাওয়া।
উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে পূর্ণিমাকে দেখতে লাগলো। শ্যামলের চোখে জল ,শ্যামল কাঁদতে কাঁদতে বললো আজ পর্যন্ত কেউ কখনো আমাকে এমন করে মদ খেতে বারণ করেনি। আমি জানি আমার এতদিনের বদ অভ্যাস ছাড়তে কষ্ট হবে ,তবুও আজ আমি কথা দিচ্ছি আর কোনদিন আমি কোন নেশা করবোনা।
শ্যামলের মা চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে পূর্ণিমাকে জড়িয়ে ধরে যত আদর করে ,ততই ওনার চোখ থেকে জল পূর্ণিমার চুল ভিজিয়ে দেয়।
আমি বললাম সত্যি মেয়েরা মা এর জাত মা ছাড়া কেউ পারেনা এমন দান দিতে। একমা দিয়েছেন জীবন ,আর এক বোন (সেও মায়েরই এক রূপ )দিলো নিজের অঙ্গ। আজ দুই মায়ের দনে শ্যামল ফিরে পেল তার জীবন। তার উপরে আজ শ্যামলের হল জীবনের অভিষেক।
হৃদয় উজাড় করে না দিলে হয় কি এমন অভিষেক।
এক মায়ের দানে সৃষ্টি সন্তানের জীবন, আরএক মা দিলেন পুনর্জীবন।
মা ছাড়া কে পারে দিতে এমন দান, যে দানে পূর্ণ হয় সন্তানের জীবন।
<---------আদ্য নাথ -------->
==================================================================
==================================================================
Comments
Post a Comment