615> || ভুল সবাই করে ||
615> || ভুল সবাই করে ||
<--©➽--আদ্যনাথ-->
কারুর ভুল খুঁজে তা প্রকাশ করা
মোটেও কোন কৃতিত্বের নয়।
বরঞ্চ কৃতিত্ব সেটাই উচিত করা,
কারুর ভুল শোধরাতে তাকে
সময়,সুযোগ দিয়ে সাহায্য করা।
( জীবনের এক টুকরো কথা। বিশেষ কারণে জায়গা, কোম্পানি,ও মানুষের নাম গুলি কাল্পনিক )
চারদিন হল রিটায়ার করেছি।
নিজের কোয়াটারে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি।
বন্ধু বলতে ইঞ্জিনিয়ার মিত্র, এরিয়া মেনেজার ডাফরিন। পি,এস, টু জি এম খোশলে,টেকনিশিয়ান পিল্লাই,ব্যারিস্টার ঘোষ, সকলের ইচ্ছা আজ আমার কোয়াটারে দিনের লাঞ্চ করবে একসাথে।
মজাই হবে তবে ভোলার (মানে আমার রান্নার ঠাকুর,)প্রথমে একটু রাগ দেখালেও পরে নিজেই সকল সামলে
সাথে আমার সকল জিনিষ গুছিয়ে
প্যাক করতে সাহায্য করেছে।
তার পরের দিন ট্রাক আসবে , কোলকাতাতে পার্মানেন্ট শিফ্ট করে যাব নিজের বাড়িতে।
গত কাল রাত্রেই বাজার করে রেখে ছিলাম।
দের কিলো ওজনের দুটো ইলিশ। দুই কিলো চিকেন ও কিছু তরকারি বাজার।
আজ সকলের ইচ্ছা খিচুড়ি ,ইলিশ মাছ ভাজা ও চিকেন কষা হবে।
তখন সবে সকাল 10 টা বাজে।
ভোলার রান্নার গন্ধে সকলে বেশ মজা করছিল।
ভোলা মাঝে মাঝে চা দিয়ে যাচ্ছে।
ভোলার করা নির্দেশ সকাল বেলা অন্য কিছু লাল, নীল চলবে না।
আমার এখানে সকলেই ভোলাকে সমীহ করে।
কারন খাবার ব্যাপারে ভোলার ইচ্ছাই সকলকে মেনে নিতে হয়।
কোয়াটারে বেল বেজে উঠলো। দরজা খুলতেই দেখি কোট, প্যান্ট, টাই পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আমাকে কিছুক্ষন দেখলেন এবং কোন কথা না বলেই হঠাৎ আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।
আমি এমন ব্যবহারে নিজে বিব্রত বোধ করলাম।
কারণ আমি কারুর প্রণাম গ্রহণ করতে চাই না।
নিজে কারুর প্রণাম পাবার যোগ্য বলে মনে কিরি না।
প্রণাম গ্রহণ করতে অনেক গুন থাকার প্রয়োজন।
আমার তেমন একটিও গুনও আছে বলে মনে করি না।
আমি বললাম স্যার আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না। দয়া করে আপনি আপনার পরিচয় জানাবেন প্লীজ।
উপস্থিত সকল বন্ধুরা মজা দেখছিল।
ভদ্র লোক যা বললেন তাতে আমি হুস ফিরে পেলাম।
উনি বললেন " আজ আমি নর্দান কোলফিল্ডের সুরাগাছার ও,সি,পি,র
একজন ইঞ্জিনিয়ার, আমার নাম
পি কে হাসদা " (কাল্পনিক নাম)"
সে আরও কেবল "আপনারই অশেষ করুনার ফল যে আজ আমি বেঁচে আছি এবং ইঞ্জিনিয়ার হয়েছি।
সে দিন আপনি আমাকে না বাঁচলে আমি তো আত্মহত্যাই করবার মনস্থির করে নিয়ে ছিলাম।
কিন্তু আপনি আমার সম্মান বাঁচিয়ে আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন।"
আমি বললাম কোথায় আমার তো তেমন কিছু মনে পড়ছে না।
উনি আবার বললো " মনে আছে স্যার 1985 এর মে মাসে হেভি মেশিনারিজ ট্রেনিং সেন্টার ধানবাদ, (কাল্পনিক) ।
সেদিন যখন আপনি হাইড্রলিক
মেশিনারিজের ব্যাপারে আমাদের বোঝাচ্ছিলেন তখন একজন স্টুডেন্টের মানি ব্যাগ থেকে বেশ কিছু টাকা চুরি গিয়ে ছিল।
আমি সেই মানুষ যে এতো টাকা চুরিকরে আবার ফেরত দিয়ে ছিলাম।"
আমি বললাম যেন আমি কিছুই জানিনা ।
ওহঃ আমি কিকরে জানবো কে নিয়েছিল টাকা,আমিতো কনফেক্সন রুমের বাইরে ছিলাম।
সত্যই সেদিন আমি চাইনি আমরা যারা একসাথে কাজ করি তাদের মধ্যে কেউ আমার চোখে ছোট হয়ে যায়।
সেই কারণে আমি সেদিন নিজের ইচ্ছাতে
কনফেক্সন রুমের বাইরে অপেক্ষা করছিলাম।
তোমাদের মধ্যে কেউ একজন টাকাটা ফেরত দিয়েছে দেখে আমিও যার টাকা তাকে ফেরত দিয়েছি।
যার টাকা ছিল সেও জানতে চায় নি কে নিয়ে ছিল টাকা, আমিও জানতে চাইনি কে করেছে এমন কাজ।সেদিন আমি কিছুই জানতে চাইনি কারন
আমি জানতে চাইনি কেউ আমার কাছে ছোট হয়ে যাক, কারন আমরা একসাথে কাজ করি,কারুর আত্মসন্মানে আমি আঘাত দিতে চাইনি।
ওহঃ তা আপনিই করেছিলে সেদিন এমন কাজ।
যাইহোক সেদিন আমি আনন্দ অনুভব করছিলাম এই ভেবে যে যেই করেথাকুক এমন কাজ সে তার ভুল বুঝতে পেরে টাকা গুলি ফেরত দিয়ে সে যেমন নিজের আত্মসন্মান রক্ষা করেছে সাথে আমার সম্মানও রক্ষা করেছিল।
( ভদ্র লোকটির নাম আজ আমি প্রকাশ করছি না
শুধু এক কাল্পনিক নাম দিচ্ছি পি,কে,হাসদা,)
হাসদা বললেন আমি যখন টাকা গুলি নিয়ে
চুপ করে বসেছিলাম দেখি যার টাকা সে কোন প্রকার অস্বস্তি প্রকাশ না করে শুধু আপনাকে গিয়ে তার টাকা চুরির কথা জানিয়ে ছিল।
আপনি জানালেন এই এক ঘন্টার মধ্যে কেউতো বাইরে যায়নি তবে কিকরে কখন তোমার টাকা কেউ নিতে পারে। আর যদি কেউ নিয়েও থাকে সেতো আমাদের মধ্যে এই ক্লাসেই উপস্থিত আছে।
তারপরে আপনিও কাউকে কিছু না বলে ক্লাসের শেষে বলেছিলেন "আজ তোমরা সকলে একবার অবশ্যই কনফেক্সন রুমে যাবে এবং তোমরা নিজের নিজের মনের সকল গ্লানি দূর কবর জন্য নিজেরা নিজেদের সকল অন্যায় কে ঈশ্বরের পাদপদ্মে উৎসর্গ করবে, এমনটাই আমার ইচ্ছা।
এমন কাজ করতে পারলেই দেখবে মনে অনেক শক্তির সঞ্চার হবে। ভুল কারুর দ্বারাই হতে পারে,
সেই ভুলকে ঈশ্বরের কাছে স্বীকার করলে
ঈশ্বর তাকে মাফ করেন।আশা করি তোমরা সকলে প্রাণ খুলে সত্যকে স্বীকার করবে।"
উপস্থিত সকলেই একটু অবাক হয়ে আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিল কেন আপনি এমন বলছেন।
হ্যাঁ আমার মনে আছে আমি বলেছিলাম আজ বাদে কালকে থেকে তোমরা যে যার কর্মস্থলে যোগ দেবে।
আমার উপরে নির্দেশ আসছে ট্রেনিং শেষে তোমাদের একটি পরীক্ষা নেবার।
আমার কাছে তোমাদের ওটাই পরীক্ষা।
আমি চাই তোমরা সকলে আগামী দিনে নিজের নিজের কর্ম স্থানে এমন সুন্দর করে কাজ করো, যার ফলে কোম্পানির ও তোমাদের উভয়ের লাভ হয়। আর তোমরাও অতি সত্তর উন্নতি করো।
এবং এর জন্য প্রয়োজন কর্মে একনিষ্ঠতা ও সৎ ও সুন্দর চরিত্র।
আমার বিশ্বাস আজকের এই কনফেক্সন তোমাদের
সেই সকল কাজে সহায়ক হবে।
এর পরে হাসদা একটু থেমে বললো, সেদিন আমি নিজে টাকা গুলি নিয়ে বুঝতে পেরেছিলসম ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি।
কেউ আমাকে সার্চ করলেই ধরা পড়ে যাব। আমি ভাবছিলাম টাকা গুলি কি করে ফেরত দেওয় যায়। যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে। আর আপনি আমাকে আমার ভুল শোধরাবার সুযোগ করে দিয়ে আমার সম্মান রক্ষা করেছিলেন।
আমি সেদিন কনফেক্সন রুমে গিয়ে টাকা গুলি রেখেও মনে মনে শান্তি পাইনি।
কারন আমি ভেবে ছিলাম আপনি সকল সত্য প্রকাশ করে দেবেন।
কিন্তু না তিন সপ্তাহ ক্লাস করার পরেও আপনি আসল সত্য কারুর কাছে প্রকাশ করেননি।
এই সত্য প্রকাশ হলে আমার আত্মহত্যা ছাড়া কোন পথ ছিল না।
কিন্তু না আপনি কিছুই প্রকাশ না করে আমাকে বাঁচিয়েছেন। আমাকে আমার ভুল শোধরাতে সাহায্য করেছিলেন।
অন্যায় করেছিলাম কিন্তু সেই অন্যায়কে নীরবে শোধরাবার জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন।
এমন শিক্ষার পরে আর কোন দিন অন্যায় করিনি।
ওই এক অন্যায়ের গ্লানি আজও ভুলতে পারিনি।
আমি সেই অন্যায় কাজের জন্য ক্ষমা চাইতে আপনার অনেক খোঁজ করেছি।কিন্তু কোন খোঁজ পাইনি।
গত পরশু দিন আমাদের এক ফিটার হঠাৎ একটি খবরের কাগজ দেখিয়ে আমাকে বললেন দেখুন তো এই লোকটি ই কি আপনার সেই না খুঁজে পাওয়া মানুষ?
আমি খবরের কাগজে আপনার ফটো দেখেই জানতে পারলাম আপনি রিটায়ার করেছেন, তাই আপনার ফটো সহ বিদায় অভ্যর্থনার খবর ছেপে বেরিয়েছে।
আমি চিনতে পেরেই চলে আসলাম আপনার অফিসে এবং সেখান থেকে আপনার কোয়াটারে।
আর আপনি জানেন কিনা জানিনা আমাদের ওখানের কলিয়ারিতে আপনার অনেক ভক্ত আছে।
যারা সকলেই আজও আপনার নাম করে।
আপনি নাকি ওদের অনেকের চাকুরি করে দিয়েছেন।
অনেক মানুষকে ভালো করে বাঁচতে শিখিয়েছেন।
তবে একটি কথা আমাকে বার বার ভাবিয়েছে আপনার মতন মানুষ নাকি অনেকবার চার্জশিট পেয়ে ছিলেন।
আমি বললাম চার্জশিট বা ওয়ার্নিং ওসকলের চিন্তা করলে কোনদিন কোন ভালো কাজ করতে পারবেনা।
দেখো তখন ওখানকার কলিয়ারিতে অনেক লোক নেবার সুযোগ ছিল।
সেই কারণে আমি এলাকার ছেলেরা যাতে
ক্যাজুয়াল থেকে পার্মানেন্ট হবার সাথে সাথে ভালো করে কাজ শিখে যায় তার সাহায্য করতাম।
কারুর চাকুরী করে দেবার আমি কে।
আমি চাইতাম যেন সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার পায়।কোন গরীব যেন প্রতারিত হয়ে সে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
সে সকল দিনে প্রতিদিনই লড়াই চলতো উপর আলাদের সাথে সে সব অনেক কথা ।
ওসকল চিন্তা করে কি লাভ বলো।
মানুষ যখন তখন মানুষের জন্য কিছু করাই তো মানুষের কাজ।
আর তোমার কথা আমি আজ পর্যন্ত কাউকেই জানাই নি, আমি নিজেও তোমাকে জানতে দেয়নি
এবং তোমার বিষয়ে জানতেও চাইনি।
কারন ভুল মানুষ মাত্রেই করে।
কারুর ভুলকে খুঁজে বারকরা কোন মহান কাজ নয়।
বরঞ্চ কেউ যদি কোন ভুল করে তবে তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত সেই ভুল শুধরে নেবার জন্য।
যতক্ষন মানুষ বুঝতে নাপারে যে কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক,ততক্ষন মানুষ ভুল করে।
যখনই সে নিজের ভুলকে বুঝতে পারবে তখন সে আর সেই ভুল করবে না।
তাই কারুর কিছু ভুল হলে তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত যাতে করে সে তার ভুল বুঝে,নিজেই শুধরে নিতে পারে নিজের ভুল। আমি শুধু সেইটুকুই করেছিলাম মাত্র।
আর সেটা না করে প্রথমেই যদি সকলকে সার্চ করতাম তা হলে সেটা অন্য রকম হত।
কাউকে তার ভুল থেক মুক্তি পাবার সুযোগ নাদিয়ে সোজাসুজি তার আত্মসন্মানকে হেয় করা হত।
হ্যাঁ যদি কনফেক্সন রুমে টাকা ফেরত না পেতাম তাহলে রাস্তা একটাই ,সকলের সামনেই সকলকে সার্চ করা। আমি তেমন চাইনি।
আমি জানি যার মধ্যে সামান্য তমও আত্মসম্মান বোধ আছে সে যদি ভুল করেথাকে তবে তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে করে সে নিজের ভুল নিজেই শোধরাতে পরে।
আমি বিশ্বাস করি-----
কেউ ভুল বা অন্যায় করেছে জেনেও তাকে
ক্ষমা করে দেওয়া বা দেখেও নাদেখা,
সে এক মহানতা কার্য ক্ষমতা।
কারুর আত্মসন্মান কে সম্মান করা,
সেও এক মহান চিন্তা ধরা।
কারুর অন্যায় কে প্রশ্রয় নাদিয়ে
তার অন্যায় কে সংশোধনের জন্য তাকে
সময় সুযোগ করে দেওয়া,
সে এক উৎকৃষ্ট মহানতা।
আবার এটাও জানি---
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।
কিন্তু ক্ষমা একটি মহৎ গুণ।
সেই কারনে অপরাধীকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা সেও এক মহৎ গুন।
আপাতদৃষ্টিতে এমনটি মনে হলেও
ক্ষমারও নির্দিষ্ট সীমা থাকতে হবে।
তা না হলে অন্যায় বেড়ে গিয়ে সমাজকে
দূষিত করে তুলবে।
এর পরে হাসদাকে মধ্যান্য ভোজনের আমন্ত্রণ করলাম।
সেদিন আমরা ছয় জন মিলে দুপুরের খাবার খেলাম।
তারপতে হাসদা আবার একবার জিজ্ঞাসা করলো "সেদিন কি সত্যিই আপনি জানতেন না যে টাকাটা
আমি নিয়ে ছিলাম।"
আমি বলেছিলাম দেখো হয়তো চেষ্টা করলে আমি ঠিক জানতে পারতাম, কিন্তু আমি নিজে চাইনি জানতে, কারন আমি চাইনি কারুকে আমার চোখে ছোট করে দেখতে।
এবারে হাসদা সত্যি কান্যায় ভেঙে পড়ল।
আমি অনেক বুঝিয়ে তাকে বিদায় জানালাম।
মহুদা স্টেশনে ওনাকে ট্রেনে বসিয়ে নিজের কোয়াটারে ফিরে এসে ছিলাম।
<--©➽--আদ্যনাথ-->
=========================
Comments
Post a Comment