617>|| দোষ তো আমার || D

 617>|| দোষ তো আমার ||  D

                <--©➽-আদ্যনাথ--->


আজ ছোট্ট একটি ঘটনাকে ছোট গল্প হিসাবে লিখছি।

এই লেখার কারন টা বলছি পরে, আগে ঘটনাটি লিখি।

মনেপরে সেই 1971 সালের 28 সে ডিসেম্বর। আমরা আমাদের ক্লাসের পাঁচজন ছেলে ও তিনজন মেয়ে মিলে ঠিক করলাম 31 ডিসেম্বরে আমরা পিকনিক করবো মিতাদের বাড়ির বাগানে। নিমতার মাজেরহাটে মিতাদের বাড়িতে বেশ বড় বাগান আছে । বাগানে আম, জাম,কাঁঠাল প্রভৃতি নানান গাছ আছে। বেশ বড় বাগান। আমরা ঠিক করলাম ওই বাগানেই পিকনিক করব।

সেইমতন চিন্তা করে আমরা সকলে মিতাদের বাড়িতে গিয়ে ওর মাকে আমাদের পিকনিকের কথা বললাম।

মিতার মা এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন।

আমরা 30 তারিখে সমস্ত জিনিস জোগাড় করতে করতে  বিকেল হয়ে গেল।

তরকারি বাজার ও মশলা পাতি সব কিনে জোগাড় করে রাখলাম। চিকেন ও মাছ সকালেই কিনব ঠিক করলাম।

রান্না করার জন্য কয়লাও কিনে রাখলাম।

 সেইসময় তো আর গ্যাস ছিলোনা, কয়লা বা কাঠের আগুনেই রান্না হত। কাঠে রান্না করা বেশ ঝামেলা সেই কারণে কয়লা কিনে রাখলাম এবং ডেকরেটরের থেকে কিছু ডেকচি, কড়াই ও তরকারি কাটাবার জন্য বঠি ও হাতা ইত্যাদি সামগ্রী জোগাড় করে মিতাদের বাড়ির বারান্দাতে রেখে দিলাম।

যাতে করে সকালে এসেই রান্নার কাজ শুরু করতে কোন অসুবিধা না হয়।

মালপত্র সব রেখে আমি মিতাকে বলেছিলাম জিনিষ গুলি একটু গুছিয়ে রাখতে।

আমরা 31 তারিখে সকালে 9টা নাগাদ

যখন মিতাদের বাড়িতে পৌঁছলাম তখন দেখি সেখানে কান্না কাটি ও হুলুস্থুলু ব্যাপার। এবং মিতা ভীষণ ভাবে কাঁদছে।

মিতার কাকা মিতাকে বকেই চলেছেন।

একটু পরেই আসল ব্যাপারটা জানতে পারলাম যে মিতার কাকার ছোট ছেলের পা বেশ খানিকটা কেটে গেছে এবং পাঁচটি সেলাই পড়েছে।

আর ওই বাচ্চাটার পা কাটবার কারণ হল বাচ্চাটি সকালে খেলতে খেলতে আমরা যেখানে সকল জিনিষ রেখে ছিলাম বাচ্চাটি তার উপরে পরেগেছে এবং সেখানেই ছিল আমার রাখা বঠিটি, সেই বঠিতে বাচ্চাটির পা কেটেছে।আর সেই কারণেই মিতার কাকা ও কাকিমা মিতাকে খুব বকাবকি করছে।

সকাল বেলা এইরকম ঘটনায় আমরা সকলে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম।

আমাদের কেউ কেউ মিতাকেই যা নয় তাই বলছে।

কারন সকলের এক কথা যে মিতা কেন বঠিটা সরিয়ে সাবধানে রাখেনি। 

বঠিটা সাবধানে রাখলে এমন ঘটনা ঘটত না। তাই সকলেই সব দোষ মিতার উপরে আরপ কিরছিল।

এমন অবস্থায় আমি মিতার কাকা কাকিমা কে বোঝালাম যে মিতার কোন দোষ নাই। দোষ যদি কেউ করে থাকে সেটা আমি। কারন ওখানে কয়লা ও বঠি আমিই রেখেছিলাম এবং নিজের কাজে ফাঁকি দেবার জন্য মিতাকে ওগুলি গুছিয়ে রাখতে বলে ছিলাম।

আমিত জানতাম যে বাড়িতে তিনটি ছোট বাচ্চা আছে। তথাপি আমি  নিজের কাজ নিজে ঠিক মতন না করে বঠিটা কোন সাবধান মতন জায়গাতে না রেখে, মিতাকে অর্ডার করে চলে গিয়েছিলাম।

আমি নিজে বঠিটা সাবধানে রেখে দিলে

এমন ঘটনা ঘটতো না।

তাই আমাকেই সাবধান হওয়া উচিত ছিল। আর আপনারা শুধু শুধু মিতাকে বকাবকি করছেন।


আমি আমার দোষ  অন্যের ওপরে চাপিয়ে

ভালো মানুষ সাজতে চাই না।

অতএব আপনারা আমাকে বকতে পারেন। সম্পুর্ন দোষ আমার।

আমি নিজের দোষ স্বীকার না করে চুপ থাকতে পারবো না কারন নিজের দোষ অন্যের ওপরে চাপিয়ে আনন্দে ভাল মানুষ সেজে থাকা যায়, আর আমি সেটা করতে চাই না।

আপনারা এমনটা বলতেই পারেন যে মিতা কেন বঠি টা সাবধানে সরিয়ে রাখলো না।

সে ক্ষেত্রে ও আমিই দোষী,সমস্ত দোষ আমার, বঠিটা আমাকেই সাবধানে রাখা উচিত ছিল।

আমি আমার দ্বায়িত্ব ঠিকমতন পালন করিনি,সেই কারণে আপনারা আমাকে বকতে পারেন। আমার এহেন গর্হিত অপরাধের জন্য আমার শাস্তি   প্রাপ্য এবং সেই কারণে আপনারা আমাকে যে কোন শাস্তি দিতে পারেন, আমি সেই শাস্তি মাথা পেতে গ্রহণ করব।

 এইরকম বলার পরে বাড়ির সকলে একটু শান্ত হলেন।

আমি নিজে মিতার কাছে ক্ষমা চাইলাম।


এমনি করে সকল ব্যাপার যখন মিটে গেল তখন বোধ হয় বেলা সারে এগারটা বেজে গিয়েছিল। এর পরে আর কেউ পিকনিক করতে রাজি হল না।

আসলে তখন আর কেউই পিকনিক করতে চাইলো না বা আর পিকনিক করার মতন পরিবেশও ছিলোনা।

মিতার বাড়ির সকলে, বিশেষ করে মিতার কাকা,কাকিমা মিতাকে নানান ভাবে শান্তনা দিয়ে আমাদের পিকনিক করতে 

বললেন,কিন্তু আমাদের কেউই আর পিকনিক করতে রাজি হলামনা।

ওনারা বার বার করে কিছু রান্না করে খেয়ে যেতে বললেন।এমনকি মিতার মা নিজে রান্না করে দিতে চাইলেন।

কিন্তু আমরা সকলে এতটাই আফসেট হয়েপরেছিলাম যে কেউ আর ওখানে থাকতেই চাইলাম না সকলে চলে গেল।

আমিও ওদের সাথে চলে গেলাম।

এভাবেই সেদিনের পিকনিক তো হোলোইনা বরঞ্চ সেদিন কারুরই কিছু খাওয়াও হল না।

আমি পরেরদিন গিয়ে ডেকরেটরের ভাড়া মিটিয়ে, সকল জিনিষ ফেরত দিয়ে আসলাম। 

চাল, ডাল, কাঁচা সবজি সব বেলঘড়িয়া স্টেশনের কাছে কিছু দরিদ্র মানুষের মধ্যে   ভাগ করে বিলি করে দিলাম।

মিতা,এবং ওর বাড়ির সকলে ব্যাপারটাতে ভীষণ দুঃখ প্রকাশ করল, এবং আমিযে নিজের ওপরে সকল দোষ নিয়ে ঘটনাটিকে অন্য ভাবে মিটিয়ে দিয়েছিলাম তাতে করে মিতাযে বেশ খুশি হয়েছিল সে কথা মিতা স্বীকার করলো।

মিতার মা,কাকা, কাকিমা,আমাদের নিমন্ত্রন  করেছিলেন একদিন ওনাদের বাড়িতে  দুপুরের খাবার জন্য।

কিন্তু আমরা আর কোনদিন ওখানে যাইনি।

শেষে এমটা হবার কারনে, আমার কলেজ জীবনের এটাই ছিল প্রথম ও শেষ পিকনিক।

তার পরে আর কেউ কোন পিকনিক করেছে কিনা জানিনা। কারন এর পরে আমি বিএসসি পাশ করে চাকুরী করতে বিলাস পুর , নাগপুর,তথা মধ্যপ্রদেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। তাই আর কোন দিন কোন পিকনিক করিনি।

আর পিকনিকের নাম শুনলেই আমার সেই 1971 এর 31 ডিসেম্বরের কথা আজও মনে পরে।

সাথে ভীষণ এক আনন্দ অনুভব করি

এই ভেবে যে নিজের ভুলকে নিজে স্বীকার করার মধ্যে ভীষণ এক ভালোলাগার স্পর্শ অনুভব হয়।

যে ভালোলাগা বলে বা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।

<--©➽-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

----------01/01/2021::

------------রাত্রি 12:10 am

=========================



  


Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

626>||--দাদু ভাই--||

627>এক বর্ষার রাত::-