619>|| সর্বংসহা ||
619>|| সর্বংসহা ||
<---আদ্যনাথ---->
একটা ছাগলের পেছনে তারা করে
চিৎকার করতে করতে ছুটে চলেছে দুটি বাচ্চা মেয়ে। বড়মেয়েটির বয়স পাঁচ কি ছয় আর ছোটটির চার বছর হবে, বোধহয়।
ওরা দুজনে ছাগল টিকে জাপটে ধরে মুখ থেকে অ্যালুমিনিয়ামের হাড়িতে ছাড়িয়ে নেবার জন্য প্রাণ পনে টানাটানি করছে।
এমন দৃশ্য দেখে প্রথমে বেশ মজা লাগছিল।
একটু পরেই বুঝলাম ওই ছাগলের মুখ থেকে ওই হাড়িটা ছাড়িয়ে নেবার মতন শক্তি নাই ওই বাচ্ছা মেয়ে দুটির।
আমরা দৌড়ে গিয়ে ছাগলটাকে তাড়িয়ে হাড়িটা ওদের হাতে দিয়ে দিলাম।
হাড়িটা পেয়েই ওরা কান্না জুড়ে দিল।
এমন ঘটনাতে একটু অবাক হয়ে ওদের জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে তোমরা কাঁদছো কেন ,
ওরা যা বললো সেটা শুনে আমরা সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।
ওই হাড়িতে ওদের দুপুরে খাবার জন্য পান্তা ভাত ছিল। সেই পান্তার সবটাই ছাগলে খেয়ে নিল।
ধানবাদের কাত্রাস চারনম্বর এরিয়াতে আমাদের নুতন প্রজেক্ট শুরু হবার থেকেই আমার ডিউটির মাঝে বা টিফিনের সময় এই রামজীর চায়ের দোকানে সকলে মিলে চা খতে যেতাম। চায়ের দোকানের উল্টো দিকে রাস্তার পাশে একটা ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমারের পোস্টের চারটি পোলের সাহারায় একটা কুড়ে ঘর। প্লাস্টিক, পিচবোর্ড,ছেড়া কাপড় দিয়ে ঘেরা। প্রায় ছয় মাস হোল ওই ঝোপরিতে থাকে এক পরিবার,স্বামী ,স্ত্রী ও তিনটি বাচ্চা। পুলিশ দু- দু-বার ওই ঝোপড়ি ভেঙে দিয়ে ছিল। তাও ওরা ওখানেই আবার ঘর বানিয়ে থাকছে। ওরা এই দুটি মেয়ে ও ওদের থেকে ছোট আর একটি ছেলে ও আছে। মনেহয় ওদের বাপটা অসুস্থ, তাই ও আজকাল আর বাইরে বের হয় না। তবে ওদের মা আজকাল সকালেই বেরিয়ে যায় কাজে।রাজ মিস্তিরির সাথে রেজার কাজ করে। রাম জী আর কিছুই বলতে পারল না। আমিও আর বেশি জানতে চাইলাম না। তারপরে কদিন আমাকে মধ্যপ্রদেশে এন সি এল এতে যেতে হল ,বিশেষ কিছু কাজের জন্য। মধ্যপ্রদেশ থেকে ফিরে এসে এক দিন বিকেলে আমরা সকলে রামজীর দোকানে চা খাচ্ছি।
তখন সন্ধ্যা সাতটার হবে,দোকানের সামনে হঠাৎ একটি ভেন রিক্সায় ধাক্কা লেগে একটি বাচ্ছা ছেলে পরে গিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। আমরা দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাটিকে তুলে এনে চার নম্বর কলিয়ারীর হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ওর ফাস্ট এইড করালাম। ডাক্তার বাবু বললেন কোন ভয় নাই আর তেমন কোন চোট লাগেনি , স্রেফ একটু একটু ছিলে গেছে, মাইনর ইনজিউড়ি।
আমরা বাচ্চাটিকে নিয়ে যখন ফিরছি তখন দেখি এক ভদ্র মহিলা কাঁদতে কাঁদতে এসে বাচ্চাটিকে জড়িয়ে ধরলো।আমরা বুঝলাম ইনি বাচ্চাটির মা।
আমাদের জিপে করে ওনাদের নিয়ে আসার পরে জানতে পারলাম যে ওরাই রামজীর দোকানের উল্টো দিকের ট্রেসফর্মারের নীচে ঝোপড়ি তে থাকে। ভদ্র মহিলার সাথে আলাপ পরিচয় করে জানতে পারলাম। ওদের বাড়ি 24 পরগনার, বারাসাতে। মেয়েটি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের, এবং দশ ক্লাস পাশ। মেয়েটির নাম সুশিলা ব্যানার্জি। কিছু কারণ বসত মেয়েটি বাধ্য হয়েছে ওদের বাড়ির এক মজুরকে বিয়ে করতে। আর সেই কারণেই নানান অশান্তি, শেষে ওরা বিয়ে করে পালিয়ে গিয়ে বর্ধমানে ছিল প্রায় ছয় সাত বৎসর। ওর স্বামীর নাম বিলাস। বিলাস পরমানিক পড়াশুনা জানে না। সুশিলা বিলাস কে ভালোবেসে ফেলেছিল। বিলাস ওদের বাড়িতেই থেকে ফাইফর্মাস খাট তো।
যে কোন কারনেই হোক একদিন এক অঘটন ঘটে গেল ।আর সুশিলা গর্ভবতী হয়ে পড়লো। সুশিলার বাবা মা কেহই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি,আর সেই কারণে ওরা ঘর ছেড়ে পালিয়ে বর্ধমানে ছিল ।
কিছুদিন ধরে বিলাস টিবি রোগে আক্রন্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে যে প্লাস্টিকের কারখানায় কাজ করত সেই কাজে ওকে আর রাখতে চাইল না মালিক।
ওরা অসহায় হয়ে ধানবাদে চলে আসে, আর এই ট্রান্সফরমারের নীচে কুড়ে বানিয়ে থাকতে শুরু করে।
প্রথমে সুশিলা কলিয়ারীর কয়লা চুরি করে, পরে লেবারদের সাথে ট্রাকে কয়লা বোঝাই করার কাজ করত।
কিন্তু হঠাৎ সুশিলা আবার প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ে,ফলে ট্রাক বোঝাইয়ের কাজ করা অসম্ভব হয়ে পরে।
শেষে এক হাউসিং কমপ্লেসের এক মুন্সী কে ধরে রাজ মিস্তিরির রেজার কাজে যোগ দেয়।
বর্তমানে ও যেটুকু রোজগার করে সেইটুকু দিয়ে ওর স্বামীর চিকিৎসা ও তিনটি বাচ্চার খাবারের জোগাড় করতে হয়।
ওখানে প্রতি শুরু বার পেমেন্ট হয়। সুশিলারা অর্থাৎ ওই কমপ্লেক্সে যত রেজা কুলি কাজ করে সকলকেই ওদের আয় থেকে প্রায় অর্ধেক এক এজেন্ট বা মুন্সিকে ভেট দিতে হয়।
এই ব্যাপারটা জেনে বিক্রম ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে তখনি যাচ্ছিলো ওই মুন্সী কে ধমকানোর জন্য।
আমরা সকলে বুঝিয়ে ওকে শান্ত করলাম।
(বিক্রম আমাদের সাথে কাজ করে আসানসোলে বাড়ি ,আসলে ও নেপালি তবে বেশ লম্বা চওড়া রিষ্টপুষ্ঠ শরীর , অসম্ভব সাহস ,ওকে সকলেই সমীহ করে )
কারন এখুনি গিয়ে ওকে ধমকালে কালকে থেকে হয়তো ওদের আর কাজই দেবে না বা কাজ দিলেও এমন কাজ দেবে যে কাজ করতে পারবেনা সুশিলার মতন মেয়েরা। আর তাতে ওদের সমস্যা বাড়বে বই কমবে না।
আমাদের মধ্যে ইব্রাহিম আনসারী, বললো এমন অবস্থায় আমাদের উচিত ওদের জন্য কিছু করা।
হয়তো আমরা কিছু কিছু চাঁদা তুলে ওদের তৎকালে কিছু সহায়তা করতে পারতাম।
ইব্রাহিম বললো এভাবে আর্থিক সহায়তা না করে আমাদের উচিৎ ওদের জন্য কোন কাজ জোগার করে দেওয়া ও ওদের থাকার মতন কোন জায়গা ঠিক করে দেওয়া। আর নাহলে ওই শিশুগুলি একটাও বাঁচবে না।
ওই শিশু গুলির কথা চিন্তা করে আমাদের কিছু করা উচিত। আমি ভেবে ছিলাম সুশীলকে কোন ম্যানেজারের বাড়িতে কাজে লাগিয়ে দেব এবং বি সি সি এল এর কোন খালি কোয়াটারে ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দেব।
তখন ইব্রাহিম আমাকে বোস দার কারখানার কথা মনে করিয়ে দিল।
আমরা জানি বোস দা ভীষণ ভালো মানুষ। গরিব দুঃখিকে সবসময়েই সহায়তা করেন।
আর দেরি না করে আমরা সকলে মিলে বোস দার কারখানায় গিয়ে বোসদা কে জানালাম যে সন্তান সম্ভবা মেয়েটির রুগ্ণ স্বামী ও তিনটি বাচ্চা কে নিয়ে এভাবে রাস্তায় পরে আছে দেখে আমাদের সকলের ভীষণ খারাপ লাগলো।
তাই সকলে মিলে ঠিক করলাম আপনি যদি তৎকাল ওদের সামান্য সহায়তা করে মেয়েটকে একটা কাজ দেন আপনার কারখানাতে এবং একটু থাকার ব্যবস্থা করে দেন তো খুব ভালো হয়। ওদের এইটুকু আপাতত এইটুকু ব্যবস্থা হলেই খুব ভালো হয়, মনে কটি প্রাণ রক্ষা পাবে। বিলাসের ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা আমরাই করবো। আর একটা কথা আসলে যে কারনে আমরা ওদের জন্য এত ভাবছি তার প্রধান কারণ ওদের বড় মেয়েটি ভীষণ বুদ্ধিমান ও পড়াশুনায় ভীষণ মন। ওরা থাকে ওই কুড়ে ঘরে কিন্তু মেয়েটি কটি বই জোগাড় করে সেগুলি ভীষণ পরিপাটি করে রেখেছে। আর ওর হাতের লেখাও ভীষণ ভালো। আমরা ভাবছি ওরা একটু সহায়তা পেলেই নিশ্চই ভালো ভাবে বাঁচবে ও বাচ্চা গুলি পড়াশুনাও করতে পারবে।
বোস দা সকল শুনে এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলেন। আমরা ওদের ওই ঝুপড়ি থেকে নিয়ে এসে বোস দার কারখানায় পৌঁছে দিলাম। এবং নিশ্চিন্ত হলাম।
বোস দার কারখানার সঙ্গেই ওনার বাড়ি। বেশ কিছুদিন পরে একদিন আমি বিক্রম,
গোড়াদা, ইব্রাহিম সকলে মিলে বোস দার কারখানা তে গিয়ে ছিলাম সুশিলারা কেমন আছে সেটা জানতে। সেদিন বোস দা ছিলেন না বোস বৌদি নিজে আমাদের দেখে ভীষণ উৎসাহে অনেক কথাই বললেন। উনি জানালেন যে সুশিলার এবার একটি ছেলে হয়েছে। অর্থাৎ সুশিলার তখন দুই মেয়ে ও ছোট দুই ছেলে। সুশিলা কারখানা ও ঘর একলাই সকল দিক সামলে রাখে। কারখানার সকল হিসাব পত্র,সমস্ত মাপঝপ সব ও একলাই দেখাশুনা করে। বোস দা না থাকলেও কোন অসুবিধা হয়না কারন ,কারখানার প্রোডাকশনের সম্পুর্ন দায়িত্বই সুশিলা সামলায়।
আর বিলাস কখানার দারোয়ান, দিন রাত ও একাই পাহারা দেয়। এখন বিলাস ভালো ডাক্তারের চিকিৎসায় আছে, এবং বেশ ভালোই আছে। বিলাস নিজেও এখন পড়াশুনা করতে আগ্রহী, তাই সুশিলার মেয়ের কাছে বিলাস রোজ পড়াশুনা করে। বড় মেয়েটিকে ডীনোবলি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি।
মেয়েটি সত্যি পড়াশুনায় ভীষণ ভালো। আমরা দেখলাম সারা ঘরে তিনটি বাচ্চা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। বুঝলাম ওদের পেয়ে বোস দা ও বৌদি খুব আনন্দে আছেন। ওনাদের নিজের সন্তানের অভাব পূর্ন হয়েছে। হঠাৎ করে দেখলাম একটি বউ আমাদের জন্য চা,বিস্কুট,নিয়ে এসে আমাদের প্রণাম করতে উদ্যত হলেন, আমি এমন ঘটনায় অবাক হয়ে বউটি কে সেটা জানতে চাইলে বোস বৌদি বললেন এই সেই সুশিলা। দেখলাম সুশিলা সম্পুর্ন পাল্টে গেছে। ওর মুখমন্ডলে দেখলাম তৃপ্তি ও সন্তুষ্টির ছাপ।সুশিলা এখন ভীষণ করিত কর্মা।
বোস বৌদি বললেন সুশিলা এখন কারখানার মেনেজার আর ওনার ঘরের কেয়ার টেকার কাম বাবুর্চি,কাম ইনচার্জ। আর ওদের বাচ্চা গুলি বৌদির সারাদিনের খেলার ও আনন্দের সাথী।এমন একটি সুন্দর পরিবার দেখে আমরা সকলেই ভীষণ খুশি হয়ে ছিলাম।
সেদিনের সেই রাস্তার পাশে পরেথাকা এক অসহায় পরিবারের এমন সুন্দর পরিবর্তনে আমরা সকলেই বোস দা ও বৌদির প্রতি কিতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। আর ভাবলাম ও দেখলাম একটি মেয়ে কিভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে নিজের সন্তান ও স্বামীকে সুস্থ সুন্দর করে তুলতে পারে।আর এটাও বুঝতে পারলাম, নারীর শুভ চেতনা ও কর্ম নিষ্ঠাতে সংসার সুন্দর হয়। অর্থাৎ মেয়েরা মায়ের জাত, ওরা সব পারে,সর্বংসহা।সত্যি দেখলাম " সংসার সুন্দর হয় রমণীর গুনে।" এক "মা" ই পারেন সংসার সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে।
<--©➽-আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
===========================
Comments
Post a Comment