621>|| অসহায় ||

 621>||অসহায় ||

                      <---আদ্যনাথ--->

সেই বেকারির মাঠের পাশে থাকতো জিতেন লোহার। ছোট বেলাথেকে আমরা ওনাকে লোহাদা বলেই ডাকতাম।

বড়রা অবশ্য ওনাকে জিতেন বলেই ডাকতো। কিন্তু আমাদের কাছে উনি ছিলেন লোহাদা।

লোহার মতন শক্ত শরীর। মাঝে মাঝেই হাতের টাইসেফ বাইসেফ গুলি ফুলিয়ে দেখতো আমাদের, কখনো সরু লোহার রডের একদিক দেওয়ালের লাগিয়ে আর এক দিক নিজের গলার নীচে লাগিয়ে চাপ দিয়ে বেকিয়ে দিতেন।

তাইতো আমরা লোহাদা বলেই ডাকতাম।

লোহাদা ভীষণ ভালো মানুষ।

সব সময়েই হাসতেন।

সব সময়েই আমাদের বলতেন আমরা যেন ঝগড়া মারামারি নাকরি।

কোন কাজ করাকে পারবোনা বলে বা ভেবে যেন আমরা এড়িয়ে না যাই।

সব কাজ করতে হয় হাসি মুখে।

ওনার বাড়িতে একটা পেয়ারা গাছ ছিল খুব ভালো পেয়ারা হতো।

আমরা দুপুরে গিয়ে ঢিল মেরে পেয়ারা পারতাম।

ওনার বাড়ির লোকেরা আমাদের পেয়ারা পাড়তে দেখলেই ভীষণ বকাবকি করতেন।

লোহাদা কিন্তু কোনদিন বকতেন না বরঞ্চ উনি নিজেই পেয়ারা পেরে দিতেন।

আমাদের ভীষণ ভালো বসতেন।


সেদিন তাড়াতাড়ি হাঁটছি ,তবুও ভাবছি স্ট্যান্ডে রিক্সা থাকলে হয়। আজ ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল। সেই কারনেই ভাবনা ফাস্ট লোকালটা মিস না হয়ে যায়।

ফাস্ট ট্রেনটা মিস হলেই ব্ল্যাকডায়মন্ড 

এক্সপ্রেসও মিস হয়ে যাবে।

সেই কারণে নানা চিন্তা নিয়েই একটু জোরেই হাটছিলাম।

একটু এগোতেই দেখি জিতেন দা তার রিক্সা নিয়ে স্টান্ডের দিকে যাচ্ছেন।

আমি একটু জোরে ডাকদিলাম।

আমার ডাক শুনে জিতেন দা দাঁড়িয়ে গেলেন।


ধানবাদে ট্রান্সফার হয়ে আসার পরথেকে প্রত্যেক শনিবার রাত্রে বাড়িতে আসতাম

আর সোমবার সকালে6টা20 মিনিটের ব্ল্যাক ডায়মন্ড ধরে চলে যেতাম ধানবাদে।


শীতের সকালেও জিতেন দা ভোর 4.30 টা তে বেরিয়ে পড়তেন।

আমাদের স্টান্ডে অনেক রিক্সাই থাকতো,

কিন্তু শীত গ্রীষ্ম বারমাস সকালের ফাস্ট ট্রেন ধরতে জিতেন দা ই একমাত্র ভরসা।

সকাল আট টার পরে অনেক রিক্সা পাওয়া যেত।

যতদিন চাকুরী করেছি, দেখেছি আমাদের সেই লোহাদা কে একই ভাবে। স্কুলে পড়ার সময়ও দেখেছি লোহাদা কে রিক্সা চালাতে।

মনেপরে স্কুলে যাবার সময় যদি দেখতাম 

লোহাদা র রিক্সা, আমরা কোন চিন্তা না কোরেই ওনার রিক্সায় উঠে পড়তাম।

লোহাদা হাসতে হাসতে আমাদের পৌঁছে দিতেন স্কুলে।

শুধু স্কুলেই নয়। ওনার রিক্সা খালি দেখলেই সকল ছেলে মেয়ে উঠে পড়তো ওনার রিক্সায়।

আমরা লোহাদা কে কোনদিন রাগকরতে দেখিনি। আমাদের ভীষণ প্রিয় ছিল লোহাদা।


তারপরে বহুদিন পারহয়ে গেছে,

এখন অবসর জীবন যাপন করছি।

একদিন পোস্ট অফিসে যাবার পথে দেখলাম এক বৃদ্ধ মানুষ বহু কষ্টে তার রিক্সা টানছেন।আর তার রিক্সায় বসে এক যুবক অস্থির হয়ে ভীষণ রাগারাগি করে বলছেন কেন রিক্সা জোরে চালাচ্ছে না।

সেই কারণে যুবকটি রিক্সা থেকে নেবে গেল, এবং কোন ভাড়া নাদিয়েই চলে গেল।

আমি রাস্থায় কালিতলা মোড়ে দাঁড়িয়ে সব দেখ লাম।

এমন দৃশ্য দেখে আর স্থির থাকতে না পেরে এগিয়ে গিয়ে আমাদের সেই লোহাদা কে দেখলাম।

হার জির জিরে শরীর। সারা শরীরের চামড়া ঝুলে পড়েছে। অবসান্ত শরীর,

বয়সের ভারে ঝুকে গেছে। তবুও আজও নিজের রিক্সা নিজেই চালাচ্ছেন।

আমি কাছে গিয়ে সামনের হেন্ডেল ধরে ডাক দিলাম কি হোল লোহাদা!

বৃদ্ধ মানুষটি এমন ডাক শুনে হঠাৎ যেন চমকে গিয়ে মাথা তুলে আমাদে চিন্তে চেষ্টা করলো।

কি অদ্ভুত উনি আমার নাম ঠিক মনে রেখেছেন।

আমি শুধু বললাম আপনি ওই ছেলেটিকে কিছু বললেন না যে ভাড়া না দিয়ে চলে গেল।

আমাদের সেই লোহাদা তার অম্লান হাসি দিয়ে বললো , কি হবে বলে আমি জোরে চালাতে পারিনি তাই ও নেমে গেল।

কিছু বলে আর কি হবে।

আমি কোন কারণ ছাড়াই বললাম চলো আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেও।

এই টুকু বলতেই উনি যেন কোন মন্ত্র বলে একটু হেসে খুব তাড়াতাড়ি রিক্সা ঘুরিয়ে আমাকে নিয়ে রওনা দিলেন।

যথা রীতি উনি আমাদের পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন।

আমি বললাম এই বাড়িতে আমি আর থাকিনা এটা তো এখন আমার তিন ভাই থাকে, আমার বাড়ি একটু এগিয়ে, ওই ছোট মাঠের পরে।

বাড়িতে পৌঁছে আমি জিতেনদা কে একরকম জোর করেই ঘরে এনে বসিয়ে আমার স্ত্রীকে ডেকে বললাম দেখো কাকে নিয়ে এসেছি । সবিতা জিতেন দা কে দেখেই একটু জল ও মিষ্টি নিয়ে আসলো।

সেদিন আমি প্রথম আমার লোহাদার চোখে জল দেখেছিলাম।

অনেক কথাই হোল, এবং জানলাম ওনার জোয়ান তাগড়াই ছেলে বিষাক্ত মদ খেয়ে মারা গেছে দুটি ছেলে মেয়ে রেখে।

ওনার বাড়িতে এখন সাতজন মানুষের সংসার আর একমাত্র আয়ের জোগাড় ওনার এই রিক্সা। 

তাইতো এমন বৃদ্ধ বয়সেও ওনাকে এখনো রিক্সা চালাতে হচ্ছে।

লোহাদা সেদিন বলেছিলেন--

গরিব অসহায়ের আবার ভাগ্য কী?

আমি কিছু টাকা দিতে চাইলাম,কিন্তু উনি কিছুতেই নিলেননা।

সেদিন ওনার চোখে ছিল জল কিন্তু মনে ছিল এক অলীক শক্তির বল।

তা নাহলে এই বৃদ্ধ মানুষ কোন অমোঘ শক্তি বলে এখনো রিক্সা চালায়।

সেবার পুজোর আগে আমি কিছু জামা কাপড় কিনে দিয়ে এসে ছিলাম ওনার স্ত্রীর হাতে। সেও দিতে হয়েছিল এক রকম জোর করে। কিছুতেই নেবেন না।

শেষে আমি ওনার হাতে কোনমতে দিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম।

আজ বহু বৎসর পরে সেই বেকারির মাঠের পাশে দিয়ে যাবার সময় মনে পড়লো লোহাদার কথা।

কিন্তু দেখতে পেলামনা সেই বাড়িটা।

সেখানে এখন বেশ বড় এক ফ্লাট বাড়ি মাথা চাড়া দিয়ে উঠে বস্তি বাড়িগুলিকে গিলে খেয়ে জগৎ কে জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব। তারপরে অনেক খুঁজেছি, ওখানকার আসে পাশের অনেককেই জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু কেউই লোহাদার কোন খোঁজ দিতে পারেনি। তাছাড়া এতগুলি ঝুপড়ি ঘরের বেশ কিছু মানুষ গুলি কোথায় কেমন আছে , কেউ তার খোঁজ রাখেনা। বেশ কয়েকটি দিন ওদের খুঁজে কাউকে না পেয়ে আমার মনে হয়েছিল সত্যি জীবনটা কি পরিহাস মাত্র। আর বুঝলাম এমনি করেই ওরা হারিয়ে যায়, কেউ ওদের খোঁজ রাখেনা। কারণ ওরা অসহায় নিঃসম্বল।

         <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

============================




Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

626>||--দাদু ভাই--||

627>এক বর্ষার রাত::-