628>||-একমুঠ ভাত-||
628>||-একমুঠ ভাত-|To SV2 Souvenir 2025
--ছোট গল্প (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
<-----আদ্যনাথ---->
12/01/2025
সে অনেক দিন আগের কথা সাল তারিখ মনে নেই। সেদিন বিকেলে একলা হেটে চলছিলাম বালি ব্রিজের ফুট পাথ দিয়ে। (এখন যার নাম বিবেকানন্দ ব্রিজ)সে সময়ে তখন নিবেদিতাসেতু বা বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেস ওয়ে ইহনী।
একটু আগেই বেশ জোরে এক পসলা বৃষ্টি হয়ে গেল। এখন অবশ্য আকাশ বেশ পরিষ্কার। ব্রিজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে গঙ্গার শোভা দেখছি। মনেহচ্ছে এখন জোয়ারের টান চলছে, তাই গঙ্গার জল টই টুম্বুর। আর একটু জল বাড়লেই মনে হয় দুইকুল ছাপিয়ে জল উপচে পড়বে।
একপশলা বৃষ্টির পরে গঙ্গার জলে বিকেলের অস্তাচলে সূর্যের রক্তিম আলোর ঝলক যেন এক মায়া ময় মোহ সৃষ্টি করে চলেছে যেদিক থেকে চোখ ফেরানো দায়। নৌকা গুলি যখন উজানে বৈঠা বইছে তখন আলোর ঝটা যেন ছিটকে ছিটকে ছড়িয়ে পড়ছে।
আমি একমনে গঙ্গার সেই শোভা দেখছিলাম। দূরে বেলুর মাঠের মন্দির দেখা যাচ্ছে। সেদিন বিবেকানন্দ ব্রিজ একলাই সামলে দিতো রেল পথ ও সড়ক পথ।
সে যাই হোক এবার ফিরে যাই আসল কথায়।
সেদিন হঠাৎ---একটি বাচ্চা মেয়ে, কিছু জুঁই ফুলের মালা হাতে নিয়ে,---নেবেন বাবু একটা মালা মাত্র 5 টাকা দাম,ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথেছি দুই ভাই বোনে। মা আছেন ঘরে জ্বরে পড়ে, সারবে জ্বর অসুধ দিলে পরে।দুদিন হোল ভাত পড়েনি পেটে, তাই মালা বেচি ভাই বোনে মিলে। কিনবো অসুধ,আর একটু চাউল হাটে,ফুটিয়ে নিলে একমুঠ ভাত পড়বে পেটে। সকাল থেকে ভাইটা দেখুন কাঁদছে বসে, পেটের খিদে না পারে সইতে।
ছোট্ট মেয়েটির একনাগাড়ে এতো কথা শুনে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হৃদয়ে, নিদারুণ অনুভূতি নিয়ে, দশটি মালা নিলাম কিনে, শিশুটির চোখের জল দেখে।
টাকা পেয়েই বাচ্চা টি ভাইকে কোলে তুলে উর্দ্ধশ্বাসে ছোটে। ছোট ছোট পায়ে, কত জোরে আর ছুটতে পারে, তবুও চলছে ওরা উর্দ্ধশ্বাসে। দেখলাম ওদের মুখে হাসির ঝলক, ক্ষনিকের তরে। ওই হাসি তো নয় যেন বিদ্যুৎ চমক ছিল, ক্ষনিকের আনন্দে মনটা ভরে গেল। চেয়ে রইলাম ওদের ছোটার পথের দিকে। ওদের চাওয়া, পাওয়া একমুঠ ভাত, বোধহয় ওদের জুটবে আজ।
আন্দাজ করি বড় মেয়েটির বয়স খুব বেশি হলে দশ কি বারো হবে আর ছোট ভাই টি মনেহয় চার কি পাঁচ হবে।কিজানি কেন মনটা ব্যাকুল হলো শিশু দুটির প্রতি মনটা কেমন যেন আকৃষ্ট হলো। সেই কারণে কোনচিন্তা না করেই একটু তাড়াতাড়ি করে হেটে চললাম ওই শিশু দুটির পেছেন। দেখলাম শিশুটি তার ভাইকে কোলে নিয়ে অনেকটা পথ হেটে বালি বাজারের দিকে যাচ্ছে। ছোট টি হাটতে পারছিলনা, তাই বড় মেয়েটি মাঝে মাঝে ওকে কোলে করে ছোটার চেষ্টা কিরছিলো। দৌড়োতে আর পারছিলো না , তবুও ওরা প্রাণ পন চেষ্টা করছিল তাড়াতাড়ি চলবার। আমি একটুও এগিয়ে গিয়ে দেখলাম ওরা এক দোকানে কিছু চাউল আর বোধহয় তিনটি ডিম কিনলো। ডাল আর অন্য কিছু কিনলোকিনা বুঝতে পারলাম না। ওরা দোকান থেকে বেরহয়ে আবার চলতে লাগলো। ছোট শিশুটি আর চলতে পারছিলো না তাই বড় মেয়েটি আবার ছোটটিকে কোলে তুলে নিলো এবার বড় মেয়েটির এক হাতে কাগজের ঠোঙায় চাউর, ডিম, ইত্যাদি অন্য হাতে কোন মতে ভাইকে কোলে তুলতে চেষ্টা করছে। মাটিতে ঠোঙা টি রেখে ভাইকে কোলে নিয়ে আবার ঠোঙা টি ডান হাতে নিয়েএগিয়ে চলছে। কি দারুন পেচেস্টা, তবুওতো মরিয়া হয়েএগিয়ে চলা। হঠাৎ দেখলাম মেয়েটি কি ভেবে ওর ঠোঙা টি নিজের জামার পোটলা করে নিজের চুলের ফিতে দিয়ে শক্ত করে বেঁধে নিলো, এবার নিজের ভাইকে কোলে তুলে একটু জোরেই হাটাশুরু করলো। আমি শিশুটির বুদ্ধি দেখে মনে মনে এক প্রকস্থ সাবাসী দিয়ে নিজেও আসস্থ হলাম যাক ওদের চাউল ডিম আর পড়ে যাবর ভয় নাই ,এবার নিশ্চয়ই ওরা ওদের ঘরে পৌঁছতে পারবে। এই ভাবে হাটতে হাটতে ওরা বলি বাজারের উল্টো দিকে ওই গঙ্গার পারে ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘরে ঢুকে গেল। আমি চুপি সাড়ে সেখানে পৌঁছে যেতেই মেয়েটি আমাকে ঠিক চিনতে পারে একটু অবাক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো।ততক্ষনে মেয়েটি তিনটি ইট দিয়ে বানানো এক উনুনে কাঠ দেবার জোগাড় করছিলো। আমাকে দেখে একটু ভয় একটু বিব্রত হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি কেন এখানে। আমি বললাম তোকে আজ উনুন জ্বলতে হবে না তুই আমার সাথে চল ওই হোটেল থেকে ভাত তরকারি কিনে দিচ্ছি। বাচ্চা শিশুটি খুব আনন্দে বেরিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। আমি ওকে নিয়ে গিয়ে রাস্তার ওপারের হোটেল থেকে ওদের জন্য তিন প্লেট ভাত সাথে তরকারি ডাল ও মাছের ঝোল কিনে দিলাম।আমি আর শিশুটি দুজনে মিলে খাবার গুলি নিয়ে এসে ওদের ঘরে পৌঁছে দিলাম। ওরা নিশ্চয়ই খাবে আনন্দে।এবার আমি আবার বেরিয়ে ওই বাজারের পাশেই ডিস্পেন্সারিতে গিয়ে ডাক্তারের খোঁজ করতে জানলাম পাশের গলিতেই এক জন এম বি বিএস ডাক্তার বসেন।আমি সেখানে দিয়ে ডাক্তার বাবুর সাথে সব কথা বলতেই ডাক্তার বাবুর ব্যবহারে আমি অবাক হয়ে গেলাম। ডাক্তার বাবু আর কোন কথা না বাড়িয়ে আমার সাথে বেরিয়ে আসলেন। আমি ওনার বাক্স টা আমার হাতে নিতে চাইলে উনি কিছুতেই দিলেন না, বরঞ্চ বললেন ওটা ওনার বাক্স যেটা উনিই বয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।
আমিও আর কোন কথা না বাড়িয়ে ডাক্তার বাবুকে ওই ঝুপড়িতে নিয়ে আসলাম। ডাক্তার বাবু ভালোকরে ওই শিশুটির মাকে পরীক্ষা করে বললেন যে একে এখুনি হসপিটালে ভর্তি করতে হবে । কারন এই মহিলা এপেন্ডিসাইটিসে ভুগছে ,খুব তাড়াতাড়ি অপারেশন করতে হবে। আমি ডাক্তার বাবুকে বললাম যে কি কিকরে কি হবে। কোথায় এত টাকা কি করে জোগাড় হবে। কিন্তু ডাক্তার বাবুর কথার আমি অবাক হয়ে গেলাম। উনি বললেন আপনার কোন চিন্তা করতে হবে না। এই বলি বাজারের যুব সমিতিতে আমি নিজে গিয়ে বলে সব ব্যবস্থা করে দেবো।
এর পরে সত্যিই উনি ওই যুব সমিতির সাহায্যে ওই মহিলার ওলারেশন ও ওই বাচ্চা দুটির থাকা খাবার জন্য একজনের বাড়িতে ব্যবস্থা করে দিয়ে ছিল। এবং কয়েক দিন পরে আবার ওই যুব সমিতিতে গিয়ে জানলাম যে ঐ বাচ্চা দুটি ও তাদের মা এখন বেশ ভালোই আছে। ওই মহিলা একটি কারখানায় ইলেকট্রিক আর্মেচার বাইন্ডিং এর কাজ করে এবং কারখানার পাশেই একটা ঘর ভাড়া করে সেখানে থাকেন। আর বাচ্চা দুটি ওখানেই একজনের বাড়িতে থাকে। মেয়েটিমে ওনারা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। ছোট ছেলেটিও বেশ ভালো আছে। আমি এমন ওই যুব সমিতির কাজ দেখে ভীষণ আনন্দ অনুভব করলাম। এবং জীবনের এমন এক অভিজ্ঞতা যা চিরদিন মনে থাকবে।
তারপরে বহু বৎসর পরে আমি চাকুরী থেকে অবসরের পরে একদিন বেলুড় মঠ থেকে ফেরার পথে মনে হোল একটু খোঁজ করি ওই বাচ্চা দুটির, এখন নিশ্চই ওরা অনেক বড় বয়ে গেছে, আমিও ওদের দেখে চিনতে না পারাটাই স্বাভাবিক, তবুও একটু খোঁজ করি, এই ভেবে বলি বাজারে নেমে সেই যুব সমিতির খোঁজ করলাম। না সেই সমিতির কোনো খোঁজ পেলাম না । সেখানে এখন এক পার্টি অফিস আছে বটে কিন্তু তারা কেউ কিছুই বলতে পারল না। আমি সেই ইলেক্ট্রিক কারখানাটির খোঁজ করেও তার কোন হদিস করতে পারলাম না। আশে পাশের কিছু বয়স্ক মানুষকে জিজ্ঞাসা করেও ওদের বা ওই কারখানার কেউ কোন খবর দিতে পারলোনা। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে রইলো। আজও বার বার ওই বাচ্ছা দুটির কথা মনে পড়লেই সেদিনের সেই কথা গুলো মনে পড়ে------
"নেবেন বাবু একটা মালা মাত্র 5 টাকা দাম,
ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথেছি দুই ভাই বোনে।
মা আছেন ঘরে জ্বরে পড়ে,
সারবে জ্বর অসুধ দিলে পরে।
দুদিন হোল ভাত পড়েনি পেটে,
তাই মালা বেচি ভাই বোনে মিলে।
কিনবো অসুধ,আর একটু চাউল হাটে,
ফুটিয়ে নিলে একমুঠ ভাত পড়বে পেটে।
সকাল থেকে ভাইটা দেখুন কাঁদছে বসে,
পেটের খিদে না পারে সইতে।"
আজ সেই দিনের কথা স্বরণ করেই এই সত্য ঘটনা লিখলাম।
<----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
12/01/2025
===========================
Comments
Post a Comment