629>|| ছোট গল্প অঙ্ক টিচার ||

      629>||  ছোট গল্প অঙ্ক টিচার ||

            <----আদ্যনাথ---->

আমার বন্ধু  সুদর্শন থাপা, ওরা নেপালের বাসিন্ধা, তবে ভারতেও ওদের কিছু আত্মীয় স্বজন থাকে।

ওর মামা ধীমান সা  ধানবাদে আমাদের প্রজেক্টেই কাজ করতো হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় ধীমানের মৃত্যূহবার কারনে সুদর্শন আমার সাথেই থাকত।

আমি নিজে ওর একটা চাকরির জন্য চেষ্টা করে সব ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলাম কিন্তু সুদর্শন কিছুতেই চাকরি করতে চাইল না।

ও নিজে একজন ইঞ্জিনিয়ার লার্সন টুবরো তে কাজ করতো। কিন্তু সে চাকরি ওর ভালো লাগেনি কারণ ও নিজে ব্যবসা করবে বলে চাকরিতে ওর মন নেই।

ও বলে ব্যবসা করতেই ওর পছন্দ।

সুদর্শন আমারই সমবয়সী ও নেপাল ভুটান থেকে ছাতা, সোয়েটার এইসব নিয়ে এসে ধানবাদে বিক্রি করতো।

আমরা সকলেই ওকে বিভিন্ন প্রজেক্ট ও আসে পাশের কলিয়ারিতে  সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য ও নিজে আমার সাথে থাকতেই ভালো বসত। ও বেশ বুদ্ধিমান ও সুন্দর স্বভাবের জন্য সকলেই ওকে ভালোবাসত। ও যে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সেবিষয়ে ওর এতটুকুও গর্ব বোধ নাই।

ওর মামা মারা যাবার পরে হঠাৎ একদিন ও দেশে মানে নেপালে চলে গেল। এর পরে বহুদিন ওর সাথে আর দেখা সাক্ষাৎ হয় নি।


সেদিন আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে দার্জিলিং গিয়েছিলাম।

সেখানে দার্জিলিংয়ের ম্যালে  হঠাৎ 

সুদর্শনের সাথে দেখা হয়ে গেল।

সুদর্শন এক প্রকার জোর করেই আমাদের সকলকে একটা চায়ের দোকানে নিয়ে গেল দোকানটির নাম

Nathmulls Tea Shop.

near hotel Sunflower.

Chouk Bazaar.Darjeeling

Chowrasta Square,

Plot No:--20.

সুদর্শনের মতে এই নাথমূলসের চা এক বিশেষ চায়ের দোকান। এখানে অনেক দামি দামি দার্জিলিং টি পাওয়া যায়।

যা অন্য কোথাও তেমন ভালো পাওয়া যায় না।

আমরা সকলেই ওখানে চা খেলাম লাল চা চিনি দুধ ছাড়া স্রেফ লিকার। সত্যি অপূর্ব চা। এমন চা কোনদিন খাইনি।

দোকানের মেনু চার্ট দেখে অবাক হলাম। চা এর যে এত দাম হয় সেটা আজই জানলাম।


সুদর্শন শুনিয়েছিল ওর জীবনের অনেক গল্প। সেই গল্প গুলির মধ্যে একটি গল্প আমার ভালো লেগেছিল। আসলে এটি কোন গল্প নয় এটি একটি সত্য ঘটনা।এটি এমন ঘটনা যা আমাদের সকলের জীবনেও ঘটতে পারে বা ঘটে।

সুদর্শন বলছিল ও বর্তমানে রানীগঞ্জে থাকে । কাপড়, সোয়েটারের, ছাতা এই সকলের অনেক বড় হোলসেলের দোকান।

একজন শিক্ষিত বাঙালি মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে কড়েছে। ওর একটি ছেলেও আছে।

সুদর্শন সেই দিনের ঘটনা বলছিল চায়ের টেবিলে বসে দার্জিলিং চায়ে চুমুক দিতে দিতে। যদিও আমরা খুব একটা দামি চা অর্ডার দেয়নি।

তবে যে চা সুদর্শন অর্ডার করেছিল তার এক পটের (এক পটে 4 চার কাপ চা হয়) ₹400/-টাকা। দুধ চিনি ছাড়া লাল চা। অপূর্ব তার স্বাদ ও গন্ধ।


সুদর্শন বলছিল ওর ছেলে অমল ক্লাস ফাইবে পড়ে, পড়াশুনায় মোটামুটি ভালো।ওর স্ত্রীই ছেলেকে পড়ায়।


রোজকারের মতন সেদিন রাত্রেও  অমলের স্কুলের ডাইরিটা দেখছিলাম, ডাইরিতে আমলের স্কুলের অঙ্কের টিচার  অভিভাবক কল করেছেন।

সুজাতা (সুদর্শনের স্ত্রী) ব্যস্ত কারণ ওর অফিসে ভীষণ চাপ সেই কারণে সুদর্শিন কেই যেতে হবে আমলের স্কুলে।

আমল ক্লাস ফাইভে পড়ে ভালো ছেলে, এমন কিছু ভ'য় পাওয়ার ব্যাপার ছিল না, তবুও মনে হল স্কুল মাস্টার যখন আলাদা করে ডেকেছেন তখন নিশ্চয়ই কোনও জরুরি বিষয়।


" স্কুলে গিয়ে দেখি বেশ বড় একটি হল ঘরে বড় একটি টেবিল একদিকে

অঙ্কের টিচার বসে আছেন ধীর স্থির হয়ে, বেশ গম্ভীর মেজাজে।

কারুর নমস্কারের কোন রূপ প্রতি উত্তর দিচ্ছেন না।

মনে হোল যেন কোন থানার দারোগা

বসে আছেন আর সব অপরাধীরা বেঞ্চে বসে ডাকের অপেক্ষা করছেন।

বেশ কিছুক্ষণ পরে উনি ছাত্রদের নাম ধরে তাদের  অভিভাবক দের ডাকা শুরু করলেন।

 প্রথমে ডাক পড়লো পিন্টুর বাবার।

মাস্টার গম্ভীর গলায় বললেন "ছেলে অঙ্কে এত কম নম্বর পেয়েছে কেন,

আপনারা কি দেখেন না নাকী।"

পিন্টুর বাবা কাচু মাচু হয়ে বলল

অঙ্কর জন্য তো বেশি টাকা দিয়ে ভালো মাস্টার রেখে দিয়েছি।

ঠিক আছে এবার থেকে সব টিউশন বন্ধ করে দেবো। আর ফেল করলে ঘর থেকে রারকরে দেবো স্কুলও ছাড়িয়ে দেবো, এমন বলতে বলতে পিন্টুর বাবা পিন্টুকে ওখানেই কয়েকটা চর মেরে একরকম টানতে টানতে হলের বাইরে নিয়ে গেলেন।

ঠিক সেই সময় আমি দেখলাম রুমের 

সকল শিশুদের মুখে এক আতঙ্কের ছায়া।

এবার পরের জন শ্যামল যে কিনা

ঠিক আমাদের ফ্ল্যাটের নিচের তলায় থাকে আমলের সঙ্গেই পড়ে।

মাস্টার সেই নিজ মূর্তিতে গম্ভীর গলার বললেন "দেখেছেন ছেলের অঙ্ক খাতা? তিন তিনটে অঙ্ক ভুল করেছে।

কেন এমন হোল?"

মনে হোল শ্যামলের বাবা আশুতোষ বাবু নিজেই যেন পরীক্ষায় ফেল করে চাকরিটা নট হয়ে গেল।

ছেলেকে কান ধরে বলতে লাগলো আর যদি দেখি মোবাইল নিয়ে খেলতে তবে তোর একদিন কি আমার একদিন!

 

হলঘরে যেন এক গরম ও ভয়ানক আবহাওয়া, রুমে এসি চলছে তথাপি সকলেই যেন ঘামছে।

এর পরে ডাক পড়লো সন্তোষের।

ও বেশ ভালো ছেলে সবাই ওকে বেশ ভালো বাসে কারণ ও দাবা খেলায় অনেক প্রাইজ পেয়েছে। পরিতোষ পাবু নিজেও ছেলের জন্য বেশ গর্বিত।

এবং তার ছেলের সাফল্যের জন্য  আনন্দিত। 

মাস্টার সেই পরিতোষ বাবুকে এক রকম ধমকের সুরেই বললেন:--


"কি হচ্ছে দেখছেন সন্তোষ  আগে কোন

 দিন 90 এর নিচে পায়নি আর এবার দেখেছেন চারটে অঙ্ক ভুল।

কি করেণ আপনারা! এভাবে চললে আগে গিয়ে কোথায় দাঁড়াবে!"

পরিতোষ বাবু কি আর বলবেন অপমানে মুখ নিচু করে ছেলের দিকে কট মট করে তাকিয়ে একরকম টানতে টানতেই রুমথেকে বাইরে চলে গেলেন।

 আমি অনুভব করলাম বাচ্চাদের একে একে ডেকে নিয়ে তাদের ও তাদের বাবা মাকে এভাবে অপ'মানিত করছেন, আর অভিভাবকেরা যেন বাচ্চাদের উপরে

সেই অপ'মানের বোঝা  আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। শিশু গুলোকে একটু সহানুভূতি দেখাবার, নিদেন পক্ষে ওদের একটু বোঝানোর ভাষা কারুরই নেই।

সকলেই বাচ্চা গুলোকে বকেই চলেছে।

ওরা যেন তিনটে মার্ডার করে আজীবন জেল হবার জন্য রায় শুনে ফেলেছে।


এর পরে আমার নম্বর আসতেই 

আমি নমস্কার করে মাস্টারের কাছের চেয়ারে বসলাম আর আমল পাশে দাঁড়িয়ে রইলো।

মাস্টার সেই আগের ভঙ্গিতে বেশ গম্ভীর ও বিরক্তিতে আমাকে বলনেন "দেখেছেন দিন দিন কি অবস্থা হচ্ছে ছেলের তিনটি অঙ্ক ভুল করেছে।

মনেহয় ও একদম মনযোগ দিতে পারছে না ক্লাসে।"

আমিও ঠিক তেমনি হাসতে হাসতে বললাম স্যার চেষ্টা তো করছে ছেলে।

আরও চেষ্টা করবে আরও ভালো রেজাল্ট করার।

আমি নিশ্চই দেখবো যাতে করে ও ঠিক মতন মনদিয়ে অঙ্ক করে।

মাস্টার মহাশয় বলেন "আপনি এমন আত্মবিশ্বসের সাথে বলছেন কি করে?"

আমি বললাম দেখুন স্যার আমি চাই

ও নিজে নিজেরটা ভালো করে শিখুক।

অঙ্ক করা ও শেখার মধ্যে যে একটা আনন্দ আছে সেটা যেদিন ও বুঝবে সেদিন ও ঠিক সব অঙ্ক রাইট করতে পারবে। আমি চাই ও নিজের মতন শিখুক।

 আমি দেখলাম মাস্টার একটু

 বিস্মিত মুখে তাকালেন আমার দিকে এবং বললেন “আপনি এমন নিশ্চিন্ত কেমন করে?”

আমি বললাম স্যার আমি নিজে 

12ক্লাসে  অংকে ফেল করে ছিলাম এবং পরের বার আশি(৮০) নম্বর  পেয়েছিলাম। 

আমি কিন্তু একজন সফল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।

ওর মাও একজন সুপ্রতিষ্ঠীত সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। সেও কিন্তু অঙ্কে মেডেল পায়নি। কিন্তু অঙ্ক শিখেছে।


তাই বলছিলাম স্যার জীবনের রেজাল্ট সব সময় নম্বরে মাপা যায় না!

ওর মধ্যে ভালো হবার ভালো মানুষ হবার বোধ টুকু জাগলেই ও সব নিজে থেকেই ঠিক পারবে।

আমি আড়চোখে অনুভব করলাম ছেলের মুখে এক বীরত্বের হাসি।

মাস্টার আর কোন কথাই বললেন না।

বরঞ্চ এবার আমার নমস্কারের উত্তর উনি দিলেন এবং বললেন "আপনার মতন সকল গার্জিয়ান যদি ভাবতে পারতেন তবে সব ছেলেই পড়াশুনায় উন্নতি করতে পারতো এবং প্রকৃত মানুষ হতো।"


আমি আবার নমস্কার করে ছেলের হাত ধরে বাইরে বেরিয়ে আসলাম।

বাড়িতে এসে ছেলে বললো আজ আমরা বিরিয়ানী খাবো। তুমি অর্ডার করে দেও আমিনিয়ার বিরিয়ানী।

আমি বললাম দেখ তুই গিয়ে তোর বন্ধু 

শ্যামলকে ডেকে নিয়ে যায়।

ও নিজেও আজ আমাদের সাথে বিরিয়ানী খাবে। তা না হলে বেচারার বোধ হয় আজ আর খাওয়াই জুটবে না।

ওর মা হয়তো ওকে আজ খেতেই দেবেনা অঙ্কে কম নম্বর পাবার জন্য।


আসলে আমরা ভুলে যাই যে শিশুদের মন নরম এক তাল মাটির মতন।

ওদের শাসন তো করতে হবেই, তবে পড়াশুনার বিষয়ে বিশেষ করে অঙ্ক ইংরেজি, বাংলা এবং সকল বিষয় গুলি যেন ও ভালোকরে বুঝতে পারে আমাদের সেদিকে একটু খেয়াল রাখতে হবে।

রোজ টিউশন মাস্টার পড়িয়ে যাবার পরে একটু দেখতে হবে উনি কি পড়ালেন, যা পড়ালেন তার কতটুকু ছেলে বুঝতে পারলো এটা রোজ একটু খেয়াল রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।

তাই পড়া শোনার জন্য শাসনের থেকে ওকে ভালোবেসে বোঝাতে হবে প্রতিটি বিষয়।

তবেই সফলতা আসবে ।

পড়াশোনা কোন চা'প দিয়ে নয়, পাশে থেকে শেখালে ওরাই একদিন আমাদের থেকেও বড়ো হয়ে উঠবে।

ওদের পাশে থাকতে হবে ও যেমন চায় তেমনি ওকে হতে দিতে হবে।

ওকে ওর মতন  বেড়ে উঠতে দিতে হবে।

আমাদের শুধু ওর পাশে থেকে ওর বন্ধু হয়ে ভুল গুলি শুধরিয়ে দিতে হবে।


পরের বৎসর সত্যি আমল এবং শ্যামল ওরা দুজনেই আশি না পাক 70-75 নম্বর পেয়ে ছিল।

শুধু তাই নয় এর পর থেকে স্কুলে ওদের  দুজনের  আর কোনদিন অভিভাবক কল করেনি।"


এক শিক্ষিত ব্যবসায়ীর মুখে শিশু শিক্ষা ও শাসনের এমন সুন্দর কথা শুনে আমি মুগ্ধ হলাম। হোক না নেপালি তাতে কি এসে যায়।

শিক্ষাই মানুষকে বুদ্ধিমান করে।

কারণ শিক্ষা মানুষকে বুদ্ধিমত্তা যোগায়।

  (সকল চরিত্র গুলি কাল্পনিক)

   <-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

                 10/09/2025

         নিজের জন্মদিনে লিখলাম।

==========================


Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

626>||--দাদু ভাই--||

627>এক বর্ষার রাত::-