630> || প্রতিবন্ধকতা জীবনকে থামায় না |

630> || প্রতিবন্ধকতা জীবনকে থামায় না  ||

               <---আদ্য নাথ---->

    সত্য ঘটনা অবলম্বনে একটু 

স্মৃতিচারণ।

মেশিন চালু করে জিপিটা নিয়ে পৌঁছে গেলাম শর্মাজির হোটেলে ।

হোটেলে  লোকজন খুব বেশি নেই।

আসলে অনেক বেলা হয়ে গেছে তাই হোটেল প্রায় খালি।

দুপুর আড়াইটা বাজে বিষণ খিদে পেয়েছে, সকাল থেকে কিছুই খাবার সময় পাইনি। কাজের ভিষিন চাপ ছিল ভোর রাত্রেই ব্রেকডাউনের খবর পেয়ে ছুটে আসতে হয়েছে।

এটা নিরামিষ হোটেল । তাই আমি রুটি তরকারি ও সাদা দইয়ের অর্ডার করলাম।

হোটেলের ছেলেটা বিলাস আমায় জন্য খাবারের খালি আনতেই আমার চোখে পড়লো এক কোনায় একটি মেয়ে গুটি শুটি মেরে বসে আছে। 

আমি শর্মাজীকে বললাম ওই মেয়েটি কে কেন ওভাবে বসে আছে।

শর্মাজী বললেন ও কয়েকদিন ধরে রোজ আসছে। হোটেলের শেষ বাঁচা কুচা খাবারও নিয়ে যায়, বোধহয় ওর বাড়ির জন্য। আমরাতো বাঁচা খাবার ফেলেই দিতাম তাই ফেলে না দিয়ে ওকে দিয়ে দি।

এই কথা শুনে আমি বেশ একটু অবাক হয়েই মেয়েটিকে কাছে ডাকলাম।

দেখে মনে হয় এই 12 কি 13 বয়স হবে।

আকি প্রথমে জিজ্ঞাসা করলাম কিরে কিছু খাবি। মেয়েটি কোন কথা না বলে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

আমি শর্মাজী কে বলাম ভাত থাকলে ওকে একপ্লেট ভাত ডাল তরকারি দিন।

মেয়েটি ভাত খেয়ে একটু হাসলো আর বললো একটু দই খাবে , আমি শর্মাজী কে আর এক প্লেট দইয়ের অর্ডার দিলাম।

মেয়েটি বেশ আনন্দ করে খেলো।

এবার আমি ওর সাথে কথা বলে জানলাম যে ওরা ওই সাইডিংএর ধরে থাকে। রোজ কয়লা কুড়িয়ে ওদের চলে। কিন্তু কিছু দিনধরে সাইডিং এতে গার্ড ও পাহারা বেড়ে যাওয়াতে ওরা আর সাইডিং এতে ঢুকতে পারছে না। ফলে কয়লাও পাচ্ছেনা যা বিক্রি করে পয়সাও খাবার খাবে।

ওরা 5 জন ওর মা এবং ওরা দুইভাই দুইবোন। কদিন ধরে ওর মায়ের শরীর খারাপ। তাই কয়লা কুড়োতে বের হতে পারছে না। ওর বাবা মাস ছয়েক হোল কোথায় চলে গেছে । ওরা ওয়াসারির কাছে থাকতো । রাস্তা চওড়া করার সময় পুলিশ ওদের ঘর ভেঙে দিয়েছে।

তাই ওরা এই সাইডিং এর কাছে একটি ভাঙা ঘরে থাকতে শুরু করেছে।

এরপরে শর্মাজী কয়েকটা প্লাস্টিকের

ক্যারিপ্যাকে কিছু ভাত, রুটি, ডাল তরকারি এবং দুটো ডিম সেদ্ধ প্যাক করে দিলো।

বাচ্চাটি খাবার গুলি নিয়ে চলে গেল।

এরপরে আমি ব্লক2 এবং ব্লক4এর কাজে ব্যস্ত হয়ে শর্মাজীর হোটেলে আর যাওয়া হয়নি।

সপ্তা দুই পরে একদিন সময় সুযোগ পেয়ে  শর্মাজীর হোটেলে গেলাম ওই বাচ্ছা মেয়েটির ও ওর মা ও বাকি ভাইবোনদের খোঁজ খবর নিতে।

শর্মাজী সেদিন যা শোনালো তাতে বেশ দুঃখই পেলাম। কারণ শর্মাজী জানালো যে প্রায় সপ্তাহ দশ দিন হোল বাচ্চাটি আর আসছে না। তার মানে ওরা আবার অন্য কোথাও চলে গেছে।

এভাবে যে কতো পরিবার এই কোলিযারী

অঞ্চলে ঘুরে বেরিয়ে কয়লা কুড়িয়ে নিজেদের জীবন যাপন করছে তার হিসাব কে রাখে।

এমন কথা শোনার পর আমি নিজেও অনেক চেষ্টা করেছি ওদের খুঁজে বার করতে।

আসে পাশের সব সাইডিং  ওয়াসারি, সব জায়গাতে খুঁজেছি। এমন অনেক পরিবারের খোঁজ পেলেও ওই পরিবারটির আর কোন খোঁজ পাইনি।

সত্যি এমন বহুপরিবার এই অঞ্চলে এভাবেই জীবন যাপন করে।

শুধু পেটের তাগিদে ও বেঁচে থাকতে 

ভবঘুড়ে যাযাবরের মতন জীবন যাপন করে।

প্রকৃত  যাযাবর গোষ্ঠী কিন্তু দল বেঁধে বাস করে।এবং তাদের রুজি রোজগারের ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করে নানান ভাবে।

কিন্তু এই কয়লা কুড়িয়ে যে পরিবার গুলি জীবন ধারণ করে এদের ভবিষ্যৎ সত্যিই অন্ধকারে ডুবে থাকে। রোজ পুলিশ প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে এরা পালিয়ে বেড়ায়।

এরা কিন্তু সংখ্যায় কম নয়।

এরা অন্য কোন কাজ করতেও রাজি হয় না।

পরবর্তী সময়ে আমরা কয়জনে মিলে সচেষ্ট হয়ে ছিলাম এই ধরনের পরিবার গুলোকে একটু মাথা গোজার জায়গা ও কিছু কাজের ব্যবস্থা করতে। পরবর্তী সময়ে অনেক চেষ্টায় সক্ষম হয় ছিলাম দুইটি পরিবারকে বসতে।

তারাও তিন চার মাস থেকে ছিল।

ওদের কাজও জুটিয়ে দিয়ে ছিলাম।

দুই তিনটি কারখানায়।

কিন্তু কিছুদিন বাদে খবর পেলাম তারা সকলেই উধাও হয়ে গেছে।

এভাবেই পেয়েছিলাম এক বিকলাঙ্গ বাচ্ছা মেয়েকে। যার একটা পায়ে পোলিও।

ফলে এক পায়ে মাটিতে লেছরে লেছরে চলে। ওর মা বাপ ওকে ফেলে রেখে কোথায় চলে গেছে।

বাচ্চাটি না খেয়ে প্রায় মর মর অবস্থায় পেয়ে ছিলাম।

ওকে হসপিটালে নিয়ে গিয়ে সুস্থ হবার পরে ওই হসপিটালের কম্পাউন্ডার আব্দুল আলী নিজে মেয়েটিকে নিজের কাছে রেখে ছিলো। এবং পরবর্তী সময়ে জেনেছি যে দীর্ঘ চেষ্টায় মেয়েটি অনেকটাই সুস্থ হয়ে ছিল। ক্রাচে ভর দিয়ে হেটে চলে বারক্লাস পর্যন্ত পড়াশুনা করে, নিজের চেষ্টায় উলের সোয়েটার ও সায়া ব্লাউজ সেলাইয়ের কাজ করে ভালো ভাবেই আবদুলের সংসারে একজন হয়ে ছিল।

মেয়েটির সাহস ও কর্ম দক্ষতায় অবাক হয়েছিলাম। দেখেছিলাম  ওর কর্মদক্ষও দৃঢ়তার ছায়া মাখা মুখের হাসি।

যে হাসি মাখা মুখের ছবি মনে হলেই আজও মনে অনেক সাহস পাই।

নুতন কিছু করবার উৎসাহ পাই।

আব্দুল নিজে  আদর করে মেয়েটির নাম রেখেছিলেন আয়েশা।

   <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

    17/03/2026::-রাত্রি 2:15 মিনিট।

========================

 


Comments

Popular posts from this blog

618> || এক জন্ম দিন ||

626>||--দাদু ভাই--||

627>এক বর্ষার রাত::-